৪৩০০ ধর্মের মাঝে শুধু ইসলামই কেন সত্য ধর্ম? রেনে দেকার্তের অসাধারণ টেকনিক

পৃথিবীতে ২৩০ কোটি খ্রিস্টান, ২০০ কোটি মুসলিম, ১১০ কোটি হিন্দু, ৫০ কোটি বৌদ্ধ এবং দেড় কোটি ইহুদি বসবাস করেন। আর এমন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৩০০টি ধর্ম প্রচলিত আছে।

এই পরিস্থিতিতে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, “এতসব ধর্মের মধ্যে আমি কেন ইসলামকে অনুসরণ করব?” আমরা কীভাবে জানব যে ইসলামই সঠিক ধর্ম? এর কোনো যৌক্তিক প্রমাণ কি আছে?

আজ আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব দার্শনিক দেকার্তের একটি চমৎকার পদ্ধতির মাধ্যমে, যার নাম “কার্টেসিয়ান স্কেপটিসিজম” (Cartesian Skepticism)।

সহজ কথায়, পদ্ধতিটি হলো: কল্পনা করুন আপনার কাছে একটি আপেলে পূর্ণ ঝুড়ি আছে। আপনি ঝুড়িতে হাত দিয়ে একটি ভালো আপেল তুলে আনলেন। এরপর আবার হাত দিলেন এবং এবার একটি পচা আপেল পেলেন। এখন আপনার করণীয় কী? আপনি কি এক এক করে আপেল বের করে পচাগুলো ফেলে দেবেন? দেকার্ত বলছেন, কোনটি ভালো আর কোনটি পচা, তা এভাবে পরীক্ষা করার দরকার নেই। বরং পুরো ঝুড়িটি খালি করে ফেলুন এবং এরপর এক এক করে শুধু ভালো আপেলগুলো আবার ঝুড়িতে রাখুন।

আসুন, এই পদ্ধতিটি আমরা আমাদের মূল প্রশ্নের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি। আমরা কি ৪৩০০টি ধর্মকে এক এক করে যাচাই করতে পারি? আমার মনে হয় না এটা সম্ভব।

তাহলে চলুন, আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকাই এবং যুক্তি ও বিচক্ষণতা দিয়ে কিছু সূত্র বা শর্ত নির্ধারণ করি। একটি সত্য ধর্মে কী কী শর্ত থাকা উচিত, তা আমরা প্রথমে ঠিক করব। এই সূত্রগুলোই আমাদের সরাসরি “কেন ইসলাম?”—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে।

প্রথম ধাপ: ভিত্তির অনুসন্ধান

যেকোনো ভবন নির্মাণের আগে তার ভিত্তি স্থাপন করতে হয়, তাই না? ধাপে ধাপে এগোতে হয়। এক্ষেত্রেও আমাদের কিছু মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে ধাপে ধাপে ভুল ধারণাগুলোকে বাদ দিতে হবে।

আমাদের ফিল্টার বা ছাঁকনিগুলো হবে:

১. স্রষ্টা কি আছেন?

২. ধর্মের কি কোনো প্রয়োজন আছে?

৩. যদি ধর্মের প্রয়োজন থাকে, তাহলে কি ঐশী গ্রন্থ এবং একজন নবীর দরকার আছে?

আসুন, প্রথমে ভবনের ভিত্তি নিয়ে কাজ করি, অর্থাৎ স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে।

স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের অনেক উপায় থাকতে পারে। কিন্তু আজ আমরা আমাদের চারপাশের এই মহাবিশ্ব থেকেই এর উত্তর খুঁজব।

পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী, যদি কোনো কাজ সম্পন্ন হয়, তবে নিশ্চয়ই সেই কাজটি করার মতো কোনো শক্তি সেখানে উপস্থিত আছে। অর্থাৎ, আমি কোনো কাজের পেছনে যাকে কর্তা হিসেবে দেখি, সেই কাজটি করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তার থাকতে হবে। যেমন, আমি যদি দেখি একটি শিশু একটি বিমানকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আমি সাথে সাথেই এর পেছনে অন্য কোনো চালিকাশক্তি খুঁজব। কারণ আমি জানি, একটি শিশুর পক্ষে বিমান টানা অসম্ভব। আমার চোখ হয়তো দেখবে শিশুটিই বিমান টানছে, কিন্তু আমার বিবেক ও যুক্তি বলবে, “এই কাজটি করার মতো ক্ষমতা শিশুটির নেই।” আমি তখন সেই শিশুর পেছনে থাকা আসল সামর্থ্যবান কর্তাকে খুঁজতে শুরু করব। এটাই তো যৌক্তিক, তাই না?

ঠিক এই উদাহরণের মতোই, যখন আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকাই, আমরা দেখি একটি গরু দুধ তৈরি করছে। গরুটি জানে না তার তৈরি দুধে কোন কোন অ্যামিনো অ্যাসিড আছে, কিংবা যারা এই দুধ পান করবে তাদের শরীরের জন্য কী প্রয়োজন। কিন্তু সে ঠিক তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ উৎপাদন করে যাচ্ছে। আর মজার বিষয় হলো, সে এমন একটি জিনিস খেয়ে এটা তৈরি করছে, যা দুধের সাথে সবচেয়ে কম প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়—ঘাস।

অন্যদিকে, আমরা দেখি বিষাক্ত মৌমাছি সবচেয়ে মিষ্টি মধু তৈরি করছে। মৌমাছি জানে না তার তৈরি মধুতে কোন খনিজ পদার্থ আছে, বা মানুষের শরীরের জন্য এর কী কী উপকারিতা রয়েছে। কিন্তু সে এমন মধু তৈরি করে, যা মানুষের জন্য নিরাময়ের মাধ্যম হতে পারে।

আরেক দিকে তাকিয়ে দেখি, একটি গাছ শুষ্ক, স্বাদহীন, কালো মাটি থেকে রসালো, মিষ্টি আর রঙিন ফল তৈরি করছে। অথচ সেই ফলের বীজ জানে না কোন স্বাদ আমার ভালো লাগবে, কোন ঘ্রাণ আমার নাকে তৃপ্তি দেবে, বা কোন রঙ আমার চোখে সুন্দর লাগবে। আমার শরীরের কী প্রয়োজন, তাও সে জানে না। অথচ স্বাদহীন, গন্ধহীন একটি সাধারণ বীজ থেকে এমন শত শত ফল বেরিয়ে আসে, যা আমার জিহ্বার জন্য সুস্বাদু, আমার নাকের জন্য সুগন্ধযুক্ত, আমার চোখের জন্য সুন্দর এবং আমার শরীরের জন্য উপকারী।

ঠিক এই মুহূর্তে আমার যুক্তি ও বিবেক বলে ওঠে, এই কাজগুলোর পেছনে যাদেরকে কর্তা হিসেবে দেখা যাচ্ছে—গরু, মৌমাছি বা গাছ—তাদের কারোরই এই অসাধারণ কাজগুলো করার মতো জ্ঞান বা ক্ষমতা নেই। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত যে, তারা এমন কিছু দিচ্ছে যা তাদের নিজেদের কাছেই নেই। অথচ এটা তো অসম্ভব।

যেমন ধরুন, আমার হাতে থাকা এই কাপড়টি একটি পর্দা এবং আপনারা আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না। এই পর্দাটি যদি একটি কলম নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করে বা ছবি আঁকতে শুরু করে, তখন সবাই বলবে, কলমটিকে তো কাপড়টিই নাড়াচ্ছে। কিন্তু যৌক্তিক চিন্তা হলো, এই পর্দার আড়ালে নিশ্চয়ই কোনো চালিকাশক্তি আছে।

ঠিক সেভাবেই, আমরা এতক্ষণ যে কাজগুলোর কথা বললাম, সেগুলো প্রমাণ করে যে পর্দার আড়ালে একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমরা যদি এই উদাহরণগুলো মনোযোগ দিয়ে বুঝি, তাহলে আমরা আমাদের যুক্তির চোখ দিয়ে দেখতে পাব যে, একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি আমাদের জানেন, যিনি পর্দার আড়াল থেকে কাজ করেন এবং আমাদের প্রয়োজন অনুসারে সবকিছু ঘটিয়ে চলেছেন।

প্রথম ফিল্টারের পর যা বাদ গেল:

আমাদের প্রথম শর্ত—স্রষ্টার অস্তিত্ব—যদি পরিষ্কার হয়, তাহলে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্মের মতো ধর্মগুলো এবং নাস্তিকতা (Atheism), অজ্ঞেয়বাদ (Agnosticism), প্রকৃতিবাদ (Naturalism), সংশয়বাদ (Skepticism)-এর মতো দার্শনিক বিশ্বাসগুলো বাদ হয়ে যায়। কারণ একজন স্রষ্টা থাকতেই হবে, আপনি তাকে যে নামেই ডাকুন না কেন।

দ্বিতীয় ধাপ: ধর্মের প্রয়োজনীয়তা

এবার আসুন আমাদের দ্বিতীয় ফিল্টারে। এখানে আমরা যুক্তিশাস্ত্রের তুলনামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করব।

লক্ষ্য করলে দেখবেন, আমাদের চারপাশে একটি নিয়ম সবসময়ই কার্যকর: যখন আমাদের সামনে কোনো কাজ বা পণ্য থাকে, তখন যিনি সেটি তৈরি করেছেন, তিনিই সেটি সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। আর সেই পণ্য নিয়ে কথা বলার অধিকারও প্রথম তারই থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, আমি যখন একটি ফোন কিনি, সেটির সাথে একটি “ইউজার ম্যানুয়াল” বা ব্যবহারবিধি দেওয়া হয়, তাই না? এর মাধ্যমে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আমাকে বলে, “এই ফোনটি আমরা তৈরি করেছি। তাই যৌক্তিকভাবে এর প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় সম্পর্কে আমরাই সবচেয়ে ভালো জানি। আর এই ম্যানুয়ালটি দিয়ে আমরা সেই সত্যটিই প্রমাণ করছি।”

যদি সাধারণ একটি ফোনের জন্যও ব্যবহারবিধির প্রয়োজন হয়, তাহলে আমাদের মন প্রশ্ন করে: এটা কি সম্ভব যে মহাবিশ্বের স্রষ্টা, যিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তিনি তাদের পথ দেখানোর জন্য কোনো “ইউজার ম্যানুয়াল” পাঠাননি?

ইতিহাসজুড়ে মানবজাতি কিছু মৌলিক প্রশ্ন করে আসছে: আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? আমি কোথায় যাচ্ছি? এই জীবনে আমার উদ্দেশ্য কী?

স্রষ্টা কি আমাকে এই প্রশ্নগুলো করার মতো বিবেক দেবেন, কিন্তু সেগুলোর উত্তর সম্বলিত কোনো বার্তা দেবেন না? এটা কি সম্ভব? অবশ্যই তিনি আমাদের পথহারা বা অজ্ঞ অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না। তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন, তাঁর চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে জানাবেন এবং পথ দেখানোর জন্য একটি নির্দেশিকা পাঠাবেন।

এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমরা যে ধর্মটি খুঁজছি, তা অবশ্যই একটি ঐশী গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এর একটি সুস্পষ্ট নির্দেশিকা বা ম্যানুয়াল থাকতে হবে।

দ্বিতীয় ফিল্টারের পর যা বাদ গেল:

এই দ্বিতীয় শর্তের মাধ্যমে আমরা শিন্তোবাদ (Shintoism)-এর মতো ধর্ম এবং সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism) ও শূন্যবাদ (Nihilism)-এর মতো বিশ্বাসগুলোকে বাদ দিতে পারি, যেগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় ঐশী গ্রন্থ নেই।

তৃতীয় ধাপ: নবীর প্রয়োজনীয়তা

এখন আমি যদি আপনাদের প্রশ্ন করি, শুধু একটি বই থাকাই কি যথেষ্ট? স্কুলে তো আমাদের বই দেওয়া হয়, কিন্তু সেটাই কি যথেষ্ট? সেই বইটি পড়ানোর জন্য কি একজন শিক্ষকের প্রয়োজন হয় না?

হ্যাঁ, আমাদের এমন একজন শিক্ষক প্রয়োজন, যিনি শুধু বইটি পড়ানই না, বরং ছাত্রদের একটি শ্রেণিকক্ষে একত্রিত করে সেই বইয়ের প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন, এমনকি যারা শুনতে চায় না, তাদেরও।

এই উপমা থেকে নিশ্চয়ই আপনারা আমার মূল বক্তব্য বুঝতে পারছেন। যেমন একজন শিক্ষক উদাহরণ ও গল্পের মাধ্যমে বইটি ব্যাখ্যা করেন এবং শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তেমনই আমরা যে ধর্ম খুঁজছি, তার জন্যেও একজন পথপ্রদর্শক নেতা বা রাসূলের প্রয়োজন।

বিষয়টিকে আমরা এভাবেও ভাবতে পারি: প্রত্যেকটি বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান (theoretical knowledge) এবং তার বাস্তব প্রয়োগ (practical application) থাকে। বইয়ের লেখা হলো তাত্ত্বিক জ্ঞান। তাই এই জ্ঞানকে কীভাবে কাজে পরিণত করা যায়, বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা যায়, তা দেখানোর জন্য একজনের প্রয়োজন।

যখন একজন মানুষ প্রশ্ন করে, “আমি কীভাবে আমার জীবনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারি? কীভাবে জীবনের ম্যানুয়াল মেনে চলতে পারি?”, তখন তার এমন একজন রোল মডেলকে অনুসরণ করা প্রয়োজন, যিনি দেখিয়ে দেবেন কাজটি কীভাবে করতে হয়, যেন সে নিজেও তা করতে পারে।

আমাদের শিক্ষকের উদাহরণে ফিরে গেলে, শুধু গণিতের সূত্রগুলো জানাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো কীভাবে ব্যবহার ও প্রয়োগ করতে হয়, তা দেখাও অপরিহার্য। তাই একজন নবীর নেতৃত্ব কি আরও বেশি যৌক্তিক নয়?

এর উদাহরণ তো প্রাণী জগতেও রয়েছে। আপনি যখন একটি মৌচাকের দিকে তাকাবেন, দেখবেন সেখানে একটি বিশাল সমাজ একসঙ্গে একটি সাধারণ উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আর সেই সমাজের নেতা হিসেবে একজন রানি মৌমাছিকে নিযুক্ত করা হয়েছে। পিঁপড়ের সাম্রাজ্যেও দেখবেন একজন রানি পিঁপড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

এটা কি সম্ভব যে আল্লাহ, যিনি মৌমাছি বা পিঁপড়ের মতো ছোট ছোট প্রাণীদেরও দলনেতা ছাড়া রাখেননি, তিনি মানবজাতিকে কোনো পথপ্রদর্শক ছাড়া ছেড়ে দেবেন? আমরা এখানে মানবতার কথা বলছি, যারা পিঁপড়ে বা মৌমাছির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। আল্লাহ মানুষের ছোট্ট জিহ্বার জন্য শত শত স্বাদ তৈরি করেছেন। এটা কি সম্ভব যে তিনি মানবজাতিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে দেবেন? একজন রাসূল পাঠিয়ে তাদের পথ দেখাবেন না?

তৃতীয় ফিল্টারের পর যা বাদ গেল:

এই তৃতীয় শর্তের মাধ্যমে আমরা হিন্দুধর্ম, Cao Dai, Druze Faith-এর মতো ধর্মগুলোকে বাদ দিতে পারি, যারা কোনো নবীতে বিশ্বাস করে না। (উল্লেখ্য, হিন্দু ধর্মে অবতারের ধারণা থাকলেও ইসলামের নবী-রাসূলের ধারণার সাথে এর পার্থক্য রয়েছে।)

শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা তিনটি ধর্ম

শুরুতে আমরা বলেছিলাম পৃথিবীতে ৪৩০০টি ধর্ম রয়েছে। যখন আমরা এই তিনটি শর্ত—স্রষ্টা, ঐশী গ্রন্থ এবং নবী—প্রয়োগ করে সমস্ত ধর্ম ও দার্শনিক বিশ্বাসকে ফিল্টার করি, তখন আমাদের হাতে মাত্র তিনটি ধর্ম অবশিষ্ট থাকে: ইহুদিধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম।

এই তিনটিতেই স্রষ্টা, ঐশী গ্রন্থ এবং নবুয়তের ধারণা রয়েছে।

লক্ষ্য করুন, এই তিনটি ধর্ম যে আমাদের সকল ফিল্টার অতিক্রম করেছে, তা প্রমাণ করে যে তাদের ভিত্তি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।

ইহুদিধর্মের মূল ব্যক্তিত্ব হলেন মূসা (আ.) এবং খ্রিস্টধর্মের মূল ব্যক্তিত্ব হলেন ঈসা (আ.)। যদিও এই দুই মহান নবীর শিক্ষা বর্তমানে এই ধর্মগুলোতে বিকৃত হয়ে গেছে, কিন্তু তারা যা নিয়ে এসেছিলেন তা মূলত সত্যই ছিল।

এই দুটি ধর্মের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা উভয়ই নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসেবে স্বীকার করে না।

কিন্তু ইসলাম বলে, নবী মুহাম্মদ (সা.) হলেন আল্লাহর চূড়ান্ত রাসূল এবং ঈসা (আ.) ও মূসা (আ.)-ও তাঁরই প্রেরিত রাসূল ছিলেন।

এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, যদি আমরা প্রমাণ করতে পারি যে নবী মুহাম্মদ (সা.) একজন সত্যিকারের রাসূল, তাহলে ইসলামই একমাত্র সত্য ধর্ম হিসেবে প্রমাণিত হবে এবং মূসা (আ.) ও ঈসা (আ.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে একই বার্তা নিয়ে এসেছিলেন, তাও প্রমাণিত হবে।

চূড়ান্ত প্রমাণ: নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন

এই পর্যায়ে, তাঁর নবুয়তের অনেক প্রমাণ আমাদের সামনে আসে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি হলো তাঁর নিজের জীবন।

ভাবুন তো, নবুয়তের আগে তিনি ৪০ বছর তাঁর লোকদের মাঝে জীবনযাপন করেছেন। আর নবুয়তি জীবনের ২৩ বছরও তিনি সেই একই মানুষদের মধ্যে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। আমরা দেখব, এমন একজন ব্যক্তি (মা’আজাল্লাহ) মিথ্যাবাদী ছিলেন কি না।

যুক্তি অনুযায়ী, যারা পদমর্যাদায় একে অপরের কাছাকাছি, তারা একে অপরকে অনুকরণ করতে পারে। কিন্তু একজনের অবস্থান অন্যের চেয়ে যত নিচে থাকে, তাকে অনুকরণ করা তত কঠিন হয়ে যায়।

উদাহরণস্বরূপ, ইবনে সিনার কথা ভাবুন, যিনি একজন কিংবদন্তী চিকিৎসক ছিলেন এবং যার বই শত শত বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়েছে। একজন মূর্খ ব্যক্তি কতটুকু সফলভাবে ইবনে সিনার অভিনয় করতে পারবে? সে যদি কোনো শহরে গিয়ে বলে, “আমিই ইবনে সিনা”, কতজন তাকে বিশ্বাস করবে? কিছুদিনের মধ্যেই তার আচরণ ও কথাবার্তা থেকে মানুষ বুঝে ফেলবে যে সে একজন প্রতারক, তাই নয় কি? একজন গরিব ও সাধারণ মানুষ কখনও একজন রাজার অভিনয় করতে পারে না। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার সবকিছু চিৎকার করে বলবে যে সে একজন ভণ্ড।

এবার এই যৌক্তিক তুলনাটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি।

তিনি যে ধর্ম নিয়ে এসেছেন, তা তাঁর সম্পর্কে বলে: “তিনি এমন একজন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ অগণিত মানুষের মধ্য থেকে নবী বানিয়েছেন। তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) চূড়ান্ত রাসূল। তিনি সমস্ত মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বোচ্চ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী।”

এখানে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে: হয় তিনি সত্যিই তাই, অথবা (মা’আজাল্লাহ) তিনি একজন মিথ্যাবাদী।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি তাঁকে মিথ্যাবাদী বলবে, সে তাঁকে একজন সাধারণ মিথ্যাবাদী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। তাকে অবশ্যই তাঁকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী হিসেবে মেনে নিতে হবে, কারণ তিনি এত উঁচু একটি পদে থাকার বিষয়ে মিথ্যা বলেছেন। তাকে এমন একজন হিসেবে মেনে নিতে হবে, যে আল্লাহকে স্বীকার করে না, তাঁর শাস্তিকে ভয় পায় না এবং আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে।

ধরে নিলাম, তিনি তাই ছিলেন। কিন্তু তিনি কি ২৩ বছর ধরে এই মিথ্যা চালিয়ে যেতে পারবেন?

তিনি তাঁর নবুয়তি জীবনে হাজার হাজার মানুষের মাঝে ছিলেন এবং তারা তাঁর প্রতিটি দিক এক এক করে পর্যবেক্ষণ করেছে। আমরা জানি তিনি কোন হাতে খাবার খেতেন, কোনো স্থানে প্রবেশ করার সময় কোন পা আগে রাখতেন, এমনকি তিনি কোন ক্রমে তাঁর নখ কাটতেন—এতটা বিস্তারিতভাবে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ইতিহাসে আর কোনো ব্যক্তিকে এত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।

ভাবুন তো, তারা যদি তাঁর মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য বা ত্রুটি দেখতে পেত, তাহলে কি তারা তাঁর পাশে থেকে এত কষ্ট সহ্য করত? অবশ্যই না।

যারা তাঁকে পর্যবেক্ষণ করেছিল, তারা শুধু বিশ্বাসীই ছিল না, যারা তাঁর নবুয়তকে অস্বীকার করেছিল, তারাও তাঁকে পর্যবেক্ষণ করেছিল। তিনি তাদের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বড় হয়েছিলেন। তারা তাঁর সম্পর্কে সবকিছু জানত। তারা তাঁকে এতটাই বিশ্বাস করত যে, নবী হওয়ার আগেই তারা তাঁকে “আল-আমিন” অর্থাৎ “বিশ্বাসী” উপাধি দিয়েছিল। সবাই একমত ছিল যে তিনি কখনও মিথ্যা বলবেন না।

যারা তাঁর নবুয়তের পর তাঁর শত্রু হয়ে গিয়েছিল, তারাও তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র তাঁর কাছেই আমানত রাখত। তারা নবুয়তের আগে বা পরে, কখনোই তাঁর চরিত্রে কোনো খুঁত খুঁজে পায়নি। তারা কেবল তাঁকে “জাদুকর” বলে অপবাদ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি।

যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে, তার তো কোনো পার্থিব লাভ থাকে, তাই না? কিন্তু তিনি যা করেছেন, তাতে তাঁর নিজের লাভের কিছু ছিল না, বরং তাঁর জন্য সবকিছু আরও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।

তিনি দিনের পর দিন রোজা রাখতেন। দারিদ্র্যের কারণে কখনও কখনও সাহরি ও ইফতার ছাড়াই রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “কখনও কখনও তাঁর ঘরে দুই মাস ধরেও চুলায় আগুন জ্বলত না। তিনি খেজুরের মতো সাধারণ খাবার খেতেন।”

তিনি রাতের পর রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সালাত আদায় করতেন। তাহাজ্জুদের সালাত কী? রাতের শেষ তৃতীয়াংশে ঘুম থেকে জেগে সালাত আদায় করা, তাই না? এই সালাত মুসলিমদের জন্য সুন্নত, কিন্তু নবী (সা.)-এর জন্য তা ছিল ফরজ বা বাধ্যতামূলক। রাতের এমন এক সময়ে, যখন কেউ তাঁকে দেখছে না, তখন তিনি কেন নিজেকে এত কষ্ট দেবেন? একটি মিথ্যার জন্য?

তিনি যে ধর্ম নিয়ে এসেছেন, তা তিনি ২৩ বছর ধরে অন্য সবার চেয়ে ভালোভাবে অনুসরণ করেছেন, সবার চেয়ে বেশি ইবাদত করেছেন, পাপ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সবার চেয়ে বেশি সতর্ক ছিলেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদীর মধ্যে কি এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সামান্যতম অংশও থাকতে পারে?

এতসবের মধ্যে তাঁর লাভ কোথায়? তিনি কি ক্ষমতা, অর্থ বা নারীর জন্য এসব করছিলেন?

বিরোধীরা তাঁকে এসবকিছুই দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু তাঁর উত্তর সবসময় একই ছিল: “যদি তোমরা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দাও, তবুও আমি এই পথ ত্যাগ করব না।”

তিনি সারাজীবন মৃত্যুর হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। তাঁকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই সফল হয়নি। কেন তিনি একটি মিথ্যার জন্য এতকিছুর মুখোমুখি হবেন? কেন তিনি পাথর নিক্ষেপ, অভিশাপ এবং অপমান সহ্য করবেন?

তাঁর নবুয়তের প্রমাণ হিসেবে অনেক কিছুই গণনা করা যায়, কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাঁর নিজের জীবনই তাঁর নবুয়ত প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

শুরুতে যেমন বলেছিলাম, হয় তিনি সত্য বলছিলেন, অথবা (মা’আজাল্লাহ) তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন।

এখন যদি আমাদের প্রশ্ন করা হয়, “এমন একজন ব্যক্তি কি মিথ্যাবাদী হতে পারেন, নাকি যিনি তাকে মিথ্যাবাদী বলেন, তিনিই আসল মিথ্যাবাদী?”, আমার মনে হয় না এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে।

যখন আমরা এই সবকিছু বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা সেই সত্যে পৌঁছে যাই যা আমরা সারাজীবন ধরে খুঁজেছি:

  • আমরা যে স্রষ্টাকে খুঁজছি, তিনি হলেন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)
  • আমরা যে গ্রন্থটি খুঁজছি, তা হলো পবিত্র কুরআন
  • এবং আমরা যে নবীকে খুঁজছি, তিনি হলেন নবী মুহাম্মদ (সা.)

মনে আছে, শুরুতে আমরা কী জিজ্ঞাসা করেছিলাম?

৪৩০০টি ধর্মের মধ্যে কেন ইসলাম?

এটাই তার কারণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top