بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
اَلْحَمْدُ ِللهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلَى أَشْرَفِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ، أَمَّا بَعْدُ.
সম্মানিত দ্বীনি ভাই ও বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমরা সবাই একথাই জানি যে, এই দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী নয়। এটি একটি ক্ষণস্থায়ী মুসাফিরখানা, একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছেন শুধুমাত্র এই বিষয়টি যাচাই করার জন্য যে, আমাদের মধ্যে কে কাজে-কর্মে উত্তম এবং কে তার রবের প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগত। এই পৃথিবীকে আল্লাহ তা’আলা ‘দারুল ইবতিলা’ বা পরীক্ষার ঘর হিসেবে তৈরি করেছেন, ‘দারুল জাযা’ বা প্রতিদানের ঘর হিসেবে নয়। প্রতিদানের আসল জায়গা হলো আখিরাত। তাই এই পৃথিবীতে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি—এসবই পরীক্ষার একেকটি অংশ।
অনেক সময় আমরা যখন কোনো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, যখন আমাদের উপর বিপদ নেমে আসে, তখন আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, “কেন আমার সাথেই এমন হলো?” আমরা ভুলে যাই যে, এই বিপদগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি বার্তা বহন করে। এই বিপদ শাস্তি নয়, বরং পরিশোধন। এটি অবহেলা নয়, বরং মনোযোগ আকর্ষণ।
আজ আমরা পবিত্র কোরআনের এমন একটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করব, যা এই জীবনের পরীক্ষাকে বোঝার জন্য একটি পরিপূর্ণ সংবিধান। এটি এমন এক আয়াত, যা মু’মিনের অন্তরকে কঠিন সময়ে স্থির রাখে এবং তাকে আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আয়াতটি হলো সূরা আল-বাকারাহর ১৫৫ নম্বর আয়াত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
“এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।”
আসুন, আমরা এই মহান আয়াতের প্রতিটি শব্দ এবং এর গভীরতাকে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বোঝার চেষ্টা করি।
আয়াতের প্রেক্ষাপট ও ভাষার গভীরতা
সূরা আল-বাকারাহ একটি মাদানী সূরা। এই সূরা যখন নাযিল হচ্ছিল, তখন মুসলমানরা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলছিলেন। তারা একদিকে যেমন মক্কার কাফিরদের পক্ষ থেকে আক্রমণের হুমকিতে ছিলেন, তেমনি মদিনায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার এক কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। এমন এক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা’আলা এই আয়াতগুলো নাযিল করে মু’মিনদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন যে, ঈমানের পথ ফুলের বিছানা নয়। এই পথে চলতে গেলে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা আসবে এবং সেই পরীক্ষাগুলোতে উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব।
আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, وَلَنَبْلُوَنَّكُم (ওয়ালা-নাবলুওয়ান্নাকুম)।
১. لَ (লাম) এবং শেষের نَّ (নুন মুশাদ্দাদ)—আরবি ব্যাকরণে এই দুটি বর্ণ তাকিদ বা তীব্র চাপ-এর জন্য ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হলো, এখানে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আল্লাহ কসম খেয়ে বলছেন, “আমি অবশ্যই, অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব।” এটি কোনো সম্ভাবনা নয়, এটি একটি নিশ্চিত বাস্তবতা। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, প্রতিটি মু’মিনকে এই পরীক্ষার সম্মুখীন হতেই হবে।
২. نَبْلُوَنَّ শব্দটি এসেছে بلاء (বালা) থেকে, যার অর্থ পরীক্ষা করা, যাচাই করা। আল্লাহর এই পরীক্ষা কোনো কিছু জানার জন্য নয়, কারণ তিনি তো আলিমুল গাইব, তিনি সবকিছুই জানেন। বরং এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো:
* বান্দার ঈমানের স্তরকে প্রকাশ করা, যাতে বান্দা নিজেই নিজের অবস্থান বুঝতে পারে।
* বিপদের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মোচন করা।
* ধৈর্য ও আনুগত্যের মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
* মুনাফিক ও মু’মিনের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করা।
যেমন আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, “মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আল-আনকাবুত: ২)।
এরপর আল্লাহ বলেন, بِشَيْءٍ (বি-শাই’ইন), যার অর্থ “কিছুটা” বা “অল্প কিছু দিয়ে”। এখানে شيء শব্দটি অনির্দিষ্ট এবং এর শেষে তানওইন ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্বল্পতা বোঝায়। এটি আল্লাহ তা‘আলার এক মহা রহমত।। তিনি বলছেন না যে, আমি তোমাদের সমস্ত ভয়, সমস্ত ক্ষুধা বা সমস্ত সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করব। বরং তিনি বলছেন, এসবের “কিছুটা” অংশ দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। যদি আল্লাহ আমাদের উপর পূর্ণমাত্রায় বিপদ চাপিয়ে দিতেন, তবে তা সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো আমাদের থাকত না। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাঁর পরীক্ষার মধ্যেও বান্দার প্রতি দয়াবান।
পরীক্ষার ধরণ: পাঁচটি ক্ষেত্র
আল্লাহ তা’আলা এই আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে পাঁচটি ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যা দিয়ে তিনি বান্দাদের পরীক্ষা করবেন। এই পাঁচটি ক্ষেত্র মানবজীবনের প্রায় সকল দুশ্চিন্তা ও সংকটকে অন্তর্ভুক্ত করে।
১. مِّنَ الْخَوْفِ (ভয়)
ভয় মানুষের এক সহজাত অনুভূতি। আল্লাহ বলেন, তিনি ভয় দিয়ে পরীক্ষা করবেন। এই ভয় বিভিন্ন রকমের হতে পারে:
- শত্রুর ভয়: যেমনটি বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম অনুভব করেছিলেন। নিজেদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী শত্রুর মোকাবেলায় তাদের অন্তরে ভয় আসাটা ছিল স্বাভাবিক।
- ভবিষ্যতের ভয়: রিযিকের অনিশ্চয়তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, ক্যারিয়ারের ভয়—এগুলো আধুনিক জীবনের অংশ।
- নিরাপত্তাহীনতার ভয়: রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, চুরি-ডাকাতির ভয় আমাদের নিরাপত্তাকে ব্যাহত করে।
- সম্মান হারানোর ভয়: সমাজে নিজের অবস্থান বা সম্মান হারানোর ভয়ও এক ধরনের পরীক্ষা।
এই ভয়ের চিকিৎসা হলো আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল। যখন মু’মিন বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীর সকল শক্তি একত্রিত হয়েও তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না যদি আল্লাহ না চান, তখন তার অন্তর থেকে সকল ভয় দূর হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, “…সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মু’মিন হও।” (সূরা আলে ইমরান: ১৭৫)।
২. وَالْجُوعِ (ক্ষুধা)
ক্ষুধা বলতে এখানে আক্ষরিক অর্থেই খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ বা দারিদ্র্যকে বোঝানো হয়েছে। ইতিহাসে বহু নবী ও তাঁদের অনুসারীদের এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে।
- রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীদের জীবন: মক্কায় শি’আবে আবি তালিবে তিন বছর অবরুদ্ধ থাকাকালে সাহাবীরা ক্ষুধার জ্বালায় গাছের পাতা ও শুকনো চামড়া খেতে বাধ্য হয়েছিলেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূল (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীরা পেটে পাথর বেঁধেছিলেন।
- আধুনিক প্রেক্ষাপট: বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা, চাকরিচ্যুতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু মানুষ খাদ্যাভাবের শিকার হয়। এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ দেখতে চান, বান্দা কি হারাম উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, নাকি অল্পে তুষ্ট থেকে ধৈর্যের সাথে হালাল পথের উপর অটল থাকে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় থেকেও যে ব্যক্তি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই প্রকৃত সফল।
৩. وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ (মাল বা সম্পদের ক্ষতি)
সম্পদের ক্ষতি নানাভাবে হতে পারে: ব্যবসায় লোকসান, চাকুরি চলে যাওয়া, চুরি বা ছিনতাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্পদহানি ইত্যাদি। সম্পদ মানুষের অত্যন্ত প্রিয় বস্তু। তাই এর ক্ষতিতে অন্তর ব্যথিত হয়।
- মুহাজির সাহাবীদের ত্যাগ: মক্কা থেকে হিজরত করার সময় সাহাবায়ে কেরাম তাদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু আল্লাহর জন্য ছেড়ে এসেছিলেন। তারা শূন্য হাতে মদিনায় পৌঁছেছিলেন। এটি ছিল সম্পদের মাধ্যমে এক বিশাল পরীক্ষা।
- আইয়ুব (আঃ)-এর পরীক্ষা: আল্লাহ তা’আলা নবী আইয়ুব (আঃ)-কে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি সবকিছু কেড়ে নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন, কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র অভিযোগ না করে ধৈর্যের সর্বোচ্চ উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ যাচাই করেন, বান্দার ভালোবাসা কি সম্পদের প্রতি, নাকি সম্পদদাতার প্রতি? যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, সম্পদ আল্লাহর দান এবং তিনিই তা ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখেন, তার জন্য এই ক্ষতি সহ্য করা সহজ হয়ে যায়।
৪. وَالْأَنفُسِ (জান বা জীবনের ক্ষতি)
এটি সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। এর দুটি অর্থ হতে পারে:
- প্রিয়জনের মৃত্যু: বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যু মানুষকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রাঃ), চাচা হামজা (রাঃ) এবং নিজের সন্তানদের ইন্তেকাল দেখেছেন। নিজের শিশুপুত্র ইবরাহীমের মৃত্যুর সময় তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু মুখ থেকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বের হয়নি। তিনি বলেছিলেন, “চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করছে, অন্তর ব্যথিত, কিন্তু আমরা মুখে এমন কথাই বলব যা আমাদের রবকে সন্তুষ্ট করে।” (সহীহ বুখারী)
- নিজের জীবনের উপর আঘাত: এর অর্থ হতে পারে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, অঙ্গহানি বা আল্লাহর পথে জিহাদে শাহাদাতবরণ। সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেননি।
এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো, বান্দা কি ক্ষণস্থায়ী জীবনের মায়ায় পড়ে আখিরাতকে ভুলে যায়, নাকি সে বিশ্বাস করে যে এই জীবন আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার একটি মাধ্যম মাত্র।
৫. وَالثَّمَرَاتِ (ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে)
ثمرات শব্দের আক্ষরিক অর্থ ফল-ফসল। এর দ্বারা কৃষকদের ফসলের ক্ষতি, খরা, বন্যা বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শস্য নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
- বিস্তৃত অর্থ: মুফাসসিরগণ এর একটি বিস্তৃত অর্থ করেছেন। ‘সামারাত’ মানে শুধু গাছের ফল নয়, বরং মানব জীবনের সকল প্রচেষ্টার ফল। যেমন:
- একজন ব্যবসায়ীর জন্য তার ব্যবসার লাভ হলো ‘সামারাত’।
- একজন ছাত্রের জন্য তার পরীক্ষার ভালো ফলাফল হলো ‘সামারাত’।
- একজন কর্মজীবীর জন্য তার পদোন্নতি হলো ‘সামারাত’।
- বাবা-মায়ের জন্য তাদের সুসন্তান হলো ‘সামারাত’।
সুতরাং, যখন আমাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, ব্যবসায় লাভ আসে না, সন্তান অবাধ্য হয়—এসবই وَنَقْصٍ مِّنَ الثَّمَرَاتِ-এর অন্তর্ভুক্ত। এই পরীক্ষা আমাদের শেখায় যে, ফলাফলের মালিক আমরা নই, ফলাফল আল্লাহর হাতে। আমাদের দায়িত্ব শুধু ইখলাসের সাথে চেষ্টা করে যাওয়া।
পরীক্ষার চূড়ান্ত সমাধান: وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
এই পাঁচটি কঠিন পরীক্ষার কথা বলার পরই আল্লাহ তা’আলা সমাধান ও পুরস্কারের কথা বলছেন। তিনি তাঁর নবীকে (ﷺ) নির্দেশ দিচ্ছেন: وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ (এবং ধৈর্যধারণকারীদের সুসংবাদ দিন)।
এখানে আল্লাহ বলেননি যে, “ধৈর্যধারণকারীরা সফল হবে।” বরং তিনি তাঁর হাবীবকে (ﷺ) বলছেন আপনি নিজে তাদেরকে সুসংবাদ দিন। এর মাধ্যমে আল্লাহ সাবিরীন বা ধৈর্যশীলদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেন স্বয়ং রাসূল (ﷺ) তাদের কাছে এসে বলছেন, “ভেঙে পড়ো না, তোমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ রয়েছে।”
‘সবর’ বা ধৈর্য কী?
‘সবর’ অর্থ শুধু নীরবে কষ্ট সহ্য করা নয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন, সবর হলো তিনটি জিনিসের সমষ্টি:
১. আল্লাহর আনুগত্যের উপর ধৈর্য: নিয়মিত ইবাদত করা, যেমন সালাত, সিয়াম পালন করা কষ্টকর হলেও তার উপর অটল থাকা।
২. আল্লাহর নাফরমানি থেকে ধৈর্য: গুনাহের দিকে মন আকৃষ্ট হলেও নিজেকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তা থেকে বিরত থাকা।
৩. আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের উপর ধৈর্য: যখন কোনো বিপদ বা মুসিবত আসে, তখন আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট থাকা, হা-হুতাশ না করা, ভাগ্যকে দোষারোপ না করা এবং আল্লাহর প্রতি কোনো খারাপ ধারণা পোষণ না করা।
আলোচ্য আয়াতে তৃতীয় প্রকারের সবরের কথা বলা হয়েছে। বিপদের প্রথম আঘাতেই নিজেকে সামলে নেওয়া হলো প্রকৃত সবর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “প্রকৃত সবর হলো বিপদের প্রথম মুহূর্তে।” (সহীহ বুখারী)।
ধৈর্যশীলদের পরিচয় ও পুরস্কার (আয়াত ১৫৬-১৫৭-এর আলোকে)
কারা এই ধৈর্যশীল, যাদেরকে আল্লাহ সুসংবাদ দিতে বলেছেন? পরের আয়াতেই (১৫৬) আল্লাহ তাদের পরিচয় তুলে ধরেছেন:
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“যারা, নিজেদের বিপদ-মুসিবতের সময় বলে, ‘নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।’”
এটিই হলো ধৈর্যশীলদের মূলমন্ত্র। এটি শুধু একটি দোয়া নয়, এটি একটি পরিপূর্ণ আকিদা ও জীবনদর্শন।
إِنَّا لِلَّهِ(নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য): এর অর্থ হলো, আমরা, আমাদের জীবন, সম্পদ, পরিবার—সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ। মালিকের অধিকার আছে তার মালিকানাধীন বস্তু যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করার। তিনি কিছু দিলে তা তাঁর রহমত, আর কিছু ফিরিয়ে নিলে তা তাঁর হিকমত। এই বিশ্বাস আমাদের অন্তর থেকে মালিকানার অহংকার দূর করে দেয়।وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ(এবং আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবো): এর অর্থ হলো, এই দুনিয়ার জীবন এবং এখানকার সবকিছুই অস্থায়ী। আমাদের আসল ঠিকানা আল্লাহর কাছে। এই দুনিয়ার কোনো ক্ষতিই চূড়ান্ত ক্ষতি নয়, যদি আমাদের আখিরাত নিরাপদ থাকে। এই বিশ্বাস আমাদেরকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে এবং পরকালের প্রতি মনোযোগী করে তোলে।
আর যারা এই বিশ্বাস ধারণ করে ধৈর্য ধারণ করতে পারে, তাদের জন্য আল্লাহ তিনটি পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন পরের আয়াতে (১৫৭):
أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“তারাই এমন লোক যাদের প্রতি তাদের রবের পক্ষ থেকে অফুরন্ত করুণা ও রহমত বর্ষিত হয় এবং তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত।”
১. صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ (তাদের রবের পক্ষ থেকে অফুরন্ত করুণা): صلوات শব্দটি صلاة-এর বহুবচন। আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার উপর সালাত প্রেরণ করেন, তার অর্থ হলো, আল্লাহ ফেরেশতাদের উচ্চ সমাবেশে সেই বান্দার প্রশংসা করেন। এটি এক অভাবনীয় সম্মান! যে বান্দা বিপদে ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তার আলোচনা আরশে করেন।
২. وَرَحْمَةٌ (এবং রহমত): এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ দয়া, যা তাদের কষ্টকে লাঘব করে দেয়, তাদের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং বিপদের বিনিময়ে তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করে।
৩. وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ (এবং তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত): বিপদের মুহূর্তে সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, তারাই হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, এরাই হলো প্রকৃত হিদায়াতপ্রাপ্ত বান্দা।
উপসংহার ও আমাদের জন্য শিক্ষা
ভাই ও বোনেরা, সূরা বাকারার এই একটি আয়াত আমাদের জীবনের এক পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। এটি আমাদের শেখায়:
- বাস্তবতাকে মেনে নিন: জীবন একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে বিপদ আসবেই। এটি মেনে নিয়ে এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন।
- আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করুন: আপনার উপর যে বিপদ এসেছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘কিছুটা’ মাত্র। এর চেয়েও বড় বিপদ আসা সম্ভব ছিল, যা থেকে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করেছেন।
- সবরকে আঁকড়ে ধরুন: ধৈর্য হলো মু’মিনের অস্ত্র। সবরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “জেনে রাখো — সাহায্য আসে ধৈর্যের সাথে, মুক্তি আসে কষ্টের সাথে, আর কঠিন সময়ের পরেই আসে স্বস্তি।” (মুসনাদে আহমাদ)
- ‘ইন্না লিল্লাহি…’ কে হৃদয়ে ধারণ করুন: এই বাক্যটিকে শুধু মৃতের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় বিপদে এটিকে নিজেদের মূলমন্ত্র বানিয়ে নিন।
- পুরস্কারের আশা রাখুন: মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে, প্রতিটি ফোঁটা চোখের পানির বিনিময়ে আল্লাহ আপনার গুনাহ মাফ করছেন, আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন এবং আপনার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করছেন। হাদিসে এসেছে, মু’মিনের শরীরে একটি কাঁটা বিদ্ধ হলেও তার বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সহীহ বুখারী)
আসুন, আমরা আল্লাহর কাছে এই দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে জীবন নামক এই কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি যেন আমাদেরকে সেই সকল সৌভাগ্যবানদের মধ্যে শামিল করেন, যাদের ব্যাপারে তিনি স্বয়ং সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে বিপদে অবিচল থাকার এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ করার তাওফিক দান করুন।
آمِيْن يَا رَبَّ الْعَالَمِيْنَ।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ।
وَالسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ।
Jajhakallahu Khairan!