আল্লাহ তা’আলার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত, মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হলো আল-কোরআন। এটি এমন এক গ্রন্থ যা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, সংশয় থেকে বিশ্বাসের দিকে এবং অজ্ঞতা থেকে প্রজ্ঞার দিকে পথ দেখায়। অথচ, শয়তানের এক সুনিপুণ চক্রান্তে মুসলিম উম্মাহর একটি বিশাল অংশ আজ এই কিতাব থেকে যোজন যোজন দূরে।
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো: “কোরআন একটি কঠিন গ্রন্থ। এটি বোঝা সাধারণ মানুষের কাজ নয়, এটা কেবল আলেম-ওলামাদের কাজ।”
এই একটিমাত্র ভুল ধারণা লক্ষ লক্ষ মুসলিমকে তাদের রবের পাঠানো ব্যক্তিগত চিঠিটি খুলে দেখতে বাধা দিচ্ছে। তারা ভয় পাচ্ছেন যে, তারা সাধারণ মানুষ, তারা কোরআন বুঝবেন না, অথবা ভুল বুঝে গোমরাহ (পথভ্রষ্ট) হয়ে যাবেন।
এই প্রবন্ধে আমরা কোরআন এবং সহীহ হাদীসের সুস্পষ্ট দলিলের আলোকে এই ভুল ধারণার অবসান ঘটানোর চেষ্টা করব এবং প্রমাণ করব যে, কোরআন বোঝা কেবল আপনার অধিকার নয়, বরং আপনার ঈমানী দায়িত্ব।
প্রথম অধ্যায়: আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা – “কোরআন সহজ”
আপনার মনে যে প্রশ্নটি এসেছে যে, আল্লাহ কি নিজেই কোরআনকে “সহজ” বলেননি? এই সহজ শব্দটি কি শুধু আলেমদের জন্য?
এর উত্তর স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-কামার-এ দিয়েছেন। তিনি এই আয়াতে কোনো আলেম, মুফাসসির বা ফকীহকে নির্দিষ্ট করেননি, বরং সমগ্র মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ করে এই কথাটি একবার নয়, দুইবার নয়, বরং চার-চারবার বলেছেন:
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ
“আর আমি অবশ্যই কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য (লিজ-যিকর), অতএব কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?”
(সূরা আল-কামার, ৫৪: আয়াত ১৭, ২২, ৩২, ৪০)
আসুন, এই আয়াতের “সহজ” (يَسَّرْنَا) এবং “উপদেশ গ্রহণের জন্য” (لِلذِّكْرِ) শব্দ দুটি বিশ্লেষণ করি:
১. “ইয়াসসারনা” (يَسَّرْنَا) – “আমি সহজ করেছি”: আল্লাহ এখানে এই কিতাবকে “সহজ” (يَسِير) বলেননি, তিনি বলেছেন “সহজ করেছি”। এর অর্থ হলো, এই কিতাবের প্রকৃতি যেমনই হোক না কেন, আল্লাহ নিজে একে মানুষের বোঝার, মুখস্থ করার এবং উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এটি আল্লাহর একটি বিশেষ অনুগ্রহ।
২. “লিজ-যিকর” (لِلذِّكْرِ) – “উপদেশ গ্রহণের জন্য”: এই শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে, যার প্রতিটিই সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্কিত:
* স্মরণ করার জন্য: এর তেলাওয়াত সহজ, ভাষা সাবলীল।
* মুখস্থ করার জন্য: পৃথিবীর আর কোনো গ্রন্থ নেই যা কোটি কোটি মানুষ, এমনকি অনারব শিশুরাও, আগাগোড়া মুখস্থ করতে পারে।
* উপদেশ গ্রহণের জন্য: এর মূল বার্তা—তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, নৈতিকতা, জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা—এতটাই স্পষ্ট যে, একজন সাধারণ মানুষ তা পড়ে সরাসরি উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।
আল্লাহ যদি এই কিতাবকে শুধু বিশেষজ্ঞদের জন্য পাঠাতেন, তবে তিনি এই আয়াত নাযিল করতেন না। এই চারটি আয়াত হলো সাধারণ মানুষের জন্য কোরআন বোঝার পথে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।
দ্বিতীয় অধ্যায়: কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য – “তাদাব্বুর” বা গভীর চিন্তা
অনেকে যখন শোনেন যে কোরআন নিয়ে “গবেষণা” করতে হবে, তখন তারা ভয় পেয়ে যান। কোরআনের ভাষায় এই গবেষণার একটি সুন্দর শব্দ হলো “তাদাব্বুর” (تَدَبُّر), যার অর্থ হলো—গভীরভাবে চিন্তা করা, আয়াতের অন্তর্নিহিত বার্তা নিয়ে ভাবা, এর শেষ পরিণাম নিয়ে চিন্তা করা।
আল্লাহ তা’আলা কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন:
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ
“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে (লিয়্যাদদাব্বারু) এবং যাতে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।”
(সূরা সাদ, ৩৮:২৯)
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কোরআন নাযিলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষ এর আয়াত নিয়ে “তাদাব্বুর” করবে।
এর চেয়েও কঠোর ভাষায় আল্লাহ তাদের ভর্ৎসনা করেছেন যারা কোরআন নিয়ে ভাবে না। তিনি এই না ভাবাকে অন্তরে তালা পড়ে যাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
“তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা দেওয়া আছে?”
(সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:২৪)
এই আয়াতগুলো কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর জন্য নয়। আল্লাহ এখানে সকলকেই বলছেন যারা কোরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আপনি যদি কোরআন না বোঝেন, তবে তা নিয়ে “তাদাব্বুর” বা গভীর চিন্তা করবেন কিভাবে? আর যদি তাদাব্বুরই না করেন, তবে আপনার অন্তর কি তালাবদ্ধ অন্তরের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে না?
তৃতীয় অধ্যায়: হালাল ও হারাম জানার একমাত্র পথ
আপনার এই প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক: “কোরআন আপনি না পড়লে কিভাবে বুঝবেন কোন কাজকে হারাম করা হয়েছে আর কোন কাজ কে হারাম?”
আজ সমাজে অনেক কাজ “ইসলামের নামে” প্রচলিত, যার কোনো ভিত্তি কোরআন বা সহীহ হাদীসে নেই। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কাজ (যেমন যাকাত, পর্দা, হালাল উপার্জন) সম্পর্কে মানুষ উদাসীন। এর মূল কারণ হলো, আমরা আল্লাহর কিতাব থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জন করি না, বরং “লোকমুখে শোনা” বা “বাপ-দাদার আমল” থেকে ধর্ম পালন করি।
আল্লাহ তা’আলা কোরআনকে “ফুরকান” (الْفُرْقَان) বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী বলেছেন। আপনি যদি সেই পার্থক্যকারী গ্রন্থটিই না খোলেন, তবে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করবেন কিসের ভিত্তিতে?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা যদি সে দুটোকে আঁকড়ে ধরো, তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ (হাদীস)।”
(মুয়াত্তা ইমাম মালেক, সহীহ)
আপনি যদি কোরআন অর্থসহ না পড়েন, তবে আপনি কিভাবে একে “আঁকড়ে” ধরবেন? শুধু তেলোয়াত করে আলমারিতে তুলে রাখা কি “আঁকড়ে ধরা”?
যখন কিয়ামতের দিন আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, “আমি তোমার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডবুক পাঠিয়েছিলাম, তুমি কি তা পড়ে দেখেছিলে আমি কী নির্দেশ দিয়েছি?” তখন কি এই উত্তর যথেষ্ট হবে যে, “হে আল্লাহ, আমি ভয় পেয়েছিলাম যে আমি বুঝব না, তাই আমি শুধু তেলোয়াত করেছি”?
চতুর্থ অধ্যায়: কোরআন কি নাস্তিক বানায়? (একটি ভয়ংকর অপপ্রচার)
কিছু মানুষ ভয় দেখায় যে, কোরআন নিজে নিজে বুঝতে গেলে আপনি নাস্তিক হয়ে যেতে পারেন বা পথভ্রষ্ট হতে পারেন।
বাস্তবতা এর ঠিক উল্টো।
বাস্তবতা ১: কোরআন অর্থসহ পড়ে বুঝে কোনো মুসলিম নাস্তিক হয়েছে, এমন নজির ইতিহাসে নেই বললেই চলে। নাস্তিকতা আসে সাধারণত কোরআন থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকার কারণে, আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা না করার কারণে।
বাস্তবতা ২: কোরআনের ভুল খুঁজতে এসে, একে আক্রমণ করতে এসে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছে। আপনার কথাই সঠিক, শুধু ইউটিউবে খুঁজলেই আপনি শত শত বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং খ্রিষ্টান পাদ্রীর সাক্ষাতকার পাবেন, যারা কোরআনকে ভুল প্রমাণের উদ্দেশ্যে পড়তে গিয়ে এর সত্যতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
এর কারণ কী? কারণ আল্লাহ নিজেই এই কিতাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ new-line وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
“তারা কি কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? যদি এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে আসত, তবে তারা এতে বহু অসামঞ্জস্য (Discrepancy) খুঁজে পেত।”
(সূরা আন-নিসা, ৪:৮২)
কোরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা তার পাঠককে বলে, “যাও, আমার মধ্যে ভুল খুঁজে বের করো।” যখন একজন সৎ অন্বেষণকারী এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে, সে কোনো অসামঞ্জস্য খুঁজে পায় না, বরং খুঁজে পায় এক কালজয়ী অলৌকিক গ্রন্থ।
যারা ভয় দেখায় যে, কোরআন পড়লে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়, তারা হয়তো অজ্ঞতাবশত আল্লাহর এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেই জানেন না, অথবা তারা চান মানুষ এই সত্যের সন্ধান না পাক।
পঞ্চম অধ্যায়: তেলাওয়াত বনাম অনুধাবন – একটি ভারসাম্য
এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনাকে কোরআন “বুঝে” পড়তে বলা হয়, তখন এর অর্থ এই নয় যে, শুধু আরবী তেলাওয়াতের কোনো সওয়াব বা মূল্য নেই। এটা আরেকটি চরমপন্থী ধারণা।
তেলাওয়াতের সওয়াব:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোরআন তেলাওয়াতের অকল্পনীয় সওয়াবের কথা বলেছেন।
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ (অক্ষর) পাঠ করবে, সে একটি নেকী পাবে। আর প্রতিটি নেকী দশ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। আমি বলি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি হরফ; বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মীম’ একটি হরফ।”
(সুনানে তিরমিযী, সহীহ)
সুবহানাল্লাহ! শুধু তেলাওয়াতের এই মর্যাদা অন্য কোনো বইয়ের নেই। তেলাওয়াত অন্তরে প্রশান্তি আনে, ঈমান বৃদ্ধি করে এবং এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত।
কিন্তু কোরআন কি শুধু তেলাওয়াতের জন্য নাযিল হয়েছে?
না। তেলাওয়াত হলো প্রথম ধাপ, এটি হলো সেই মাধ্যম যার দ্বারা আপনি কোরআনের সাথে সংযুক্ত হবেন। কিন্তু এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো “হেদায়েত” গ্রহণ করা এবং “বাস্তবায়ন” করা।
সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কিভাবে কোরআন শিখতেন?
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন:
“আমাদের মধ্যে কেউ যখন দশটি আয়াত শিখত, সে ততক্ষণ পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলোতে যেত না, যতক্ষণ না সে এই দশ আয়াতের অর্থ বুঝত এবং সে অনুযায়ী আমল করত।”
(তাফসীর আত-তাবারী)
হযরত উমর (রা.) সূরা আল-বাকারা শিখতে (মুখস্থ করতে এবং বাস্তবায়ন করতে) বারো বছর সময় নিয়েছিলেন। কারণ তারা কোরআনকে একটি জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, শুধু বরকতের জন্য তেলাওয়াতের কিতাব হিসেবে নয়।
আপনি যদি অসুস্থ হন, ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন যদি আপনি প্রতিদিন খুব সুন্দর সুরে তেলাওয়াত করেন, কিন্তু একটি ওষুধও না খান, আপনি কি সুস্থ হবেন?
কোরআন হলো আপনার আত্মার রোগের জন্য আল্লাহর দেওয়া প্রেসক্রিপশন। একে তেলাওয়াত করতে হবে (মহব্বতের সাথে), বুঝতে হবে (মনোযোগের সাথে) এবং বাস্তবায়ন করতে হবে (আনুগত্যের সাথে)।
ষষ্ঠ অধ্যায়: বোঝার পথ – শুধু অনুবাদ নয়, তাফসীর
আপনার এই পর্যবেক্ষণটিও ১০০% সঠিক। অনেকে মনে করে “কোরআন বোঝা” মানে শুধু একটি বঙ্গানুবাদ বা ইংরেজি অনুবাদ পড়ে ফেলা। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে।
অনুবাদ (Translation): অনুবাদ আপনাকে আয়াতের আভিধানিক অর্থ (Literal Meaning) দেয়। এটি হলো প্রথম ধাপ এবং এটি আবশ্যক।
তাফসীর (Exegesis): তাফসীর আপনাকে আয়াতের গভীর ব্যাখ্যা (Explanation) দেয়। একটি আয়াতের পেছনে কী প্রেক্ষাপট (শানে নুযূল) ছিল? এই আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের বা কোনো হাদীসের কী সম্পর্ক? সাহাবীরা এই আয়াতকে কিভাবে বুঝেছিলেন?
আপনি যখন কোরআন বুঝতে যাবেন, তখন আপনার অবশ্যই একটি নির্ভরযোগ্য তাফসীরের সাহায্য নেওয়া উচিত। যেমন আপনি উল্লেখ করেছেন, “তাফসীরে ইবনে কাসীর” একটি বিশ্ববিখ্যাত এবং গ্রহণযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ, যা কোরআনের আয়াতকে অন্য আয়াত এবং হাদীস দিয়ে ব্যাখ্যা করে।
তাই, “কোরআন বোঝা” একটি প্রক্রিয়া:
১. তেলাওয়াত: শুদ্ধভাবে আরবী পড়া।
২. অনুবাদ: নিজের ভাষায় এর অর্থ জানা।
৩. তাফসীর: যখন কোনো আয়াতে গভীর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে, তখন তাফসীরের সাহায্য নেওয়া।
৪. তাদাব্বুর: আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করা যে, এখানে আমার জন্য কী শিক্ষা রয়েছে?
৫. আমল: সেই শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করা।
সপ্তম অধ্যায়: আল্লাহর ওয়াদা – “তিনিই আপনাকে বুঝ দান করবেন”
সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভয়। “আমি পারব না,” “আমি বুঝব না,” “আমার অন্তর বক্র।”
এর উত্তরে আপনার কথাটিই আমি প্রতিধ্বনি করব: “আপনি পড়া শুরু করেন আপনার অন্তরে কোরআন কে বসিয়ে দেওয়ার মালিক আল্লাহ।”
আপনি যখন কোরআন খোলেন, তখন আপনি শুধু একটি বই পড়ছেন না; আপনি আপনার রবের সাথে একটি সংযোগ স্থাপন করছেন। আপনি যখন কোনো কিছু না বুঝে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবেন, আল্লাহ কি আপনাকে সাহায্য করবেন না?
আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা করেছেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
“আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক চেষ্টা (জিহাদ) করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহ দেখিয়ে দেব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।”
(সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৬৯)
কোরআন বোঝার চেষ্টা করা কি “আল্লাহর পথে চেষ্টা” (জিহাদ) নয়? অবশ্যই এটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ জিহাদ (জিহাদ বিল-কোরআন)। আপনি যখন এই চেষ্টা শুরু করবেন, আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তিনি আপনাকে “পথসমূহ” (سُبُلَنَا) দেখিয়ে দেবেন—বোঝার পথ, আমলের পথ, হেদায়েতের পথ।
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন:
…وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“…আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর (তাকওয়া অবলম্বন কর) এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৮২)
দেখুন, শর্তটি কী? আল্লাহ বলেননি, “তোমরা পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করো, তারপর আমি শিক্ষা দেব।” তিনি বলেছেন, “তাকওয়া অবলম্বন করো” (আল্লাহকে ভয় করো, আন্তরিক হও)। আপনি যখন হেদায়েতের আন্তরিক নিয়তে কোরআন খুলবেন, তখন স্বয়ং আল্লাহ আপনার শিক্ষক হয়ে যাবেন। এর চেয়ে বড় গ্যারান্টি আর কী হতে পারে?
অষ্টম অধ্যায়: আলেমদের ভূমিকা কী? (ভারসাম্য)
তাহলে কি আমাদের আলেম-ওলামা বা স্কলারদের কোনো প্রয়োজন নেই?
এই ধারণাটিও ভুল এবং এটি আরেকটি চরমপন্থা। কোরআন বোঝার দুটি স্তর রয়েছে:
স্তর ১: সাধারণ হেদায়েত ও উপদেশ (General Guidance)
এর জন্য কোরআন সহজ। তাওহীদের কথা, শিরকের ভয়াবহতা, নবীদের কাহিনী, জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা, আখিরাতের প্রস্তুতি, হালাল-হারাম কাজের সাধারণ তালিকা (যেমন: সুদ হারাম, মদ হারাম, পিতা-মাতার খেদমত ফরজ, নামায ফরজ)—এই বিষয়গুলো বোঝার জন্য আপনার বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোরআনের ৯০% জুড়েই এই সাধারণ হেদায়েত রয়েছে। এটি বোঝা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ।
স্তর ২: ফিকহী মাসআলা ও বিধান استنباط (Legal Rulings)
কোরআন-সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস, আরবী ব্যাকরণের জটিল সূত্র, নাসিখ-মানসুখ (কোন আয়াত কোন আয়াতকে রহিত করেছে) ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে কোনো একটি নতুন বা জটিল বিষয়ে আইনী বিধান (ফতোয়া) বের করা।
যেমন: আধুনিক ব্যাংকিং সিস্টেমের কোন দিকটি সুদের আওতায় পড়বে? ডিএনএ টেস্ট কি শরীয়তে গ্রহণযোগ্য?
এই কাজটিই হলো আলেম, মুফতি ও মুজতাহিদদের কাজ। এটি একটি বিশেষায়িত জ্ঞান (Specialized Knowledge)।
আল্লাহ নিজেই এই ভারসাম্য শিখিয়েছেন। তিনি যেমন “তাদাব্বুর” করতে বলেছেন (সকলকে), তেমনি তিনি এও বলেছেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে (আহলুয যিকর) জিজ্ঞেস কর, যদি তোমরা না জান।”
(সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩)
সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিত?
একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে আপনি অবশ্যই কোরআন পড়া শুরু করবেন (স্তর ১)। পড়তে পড়তে যখন আপনি কোনো জটিল আইনী বিষয়ে বা কোনো আয়াতের গভীর ব্যাখ্যায় আটকে যাবেন (স্তর ২), তখন আপনি বিনয়ের সাথে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে যাবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন।
উদাহরণ: আপনি অসুস্থ হলে নিজেই নিজের চিকিৎসা করেন না, ডাক্তারের কাছে যান। কিন্তু সুস্থ থাকার সাধারণ নিয়ম (যেমন: স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম) আপনি নিজেই পালন করেন।
আলেমরা হলেন দ্বীনের ডাক্তার। কিন্তু কিছু মানুষ এই সম্পর্কটাকে উল্টো করে ফেলেছে। তারা সুস্থ থাকার সাধারণ নিয়মগুলোও ডাক্তারের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছে। আলেমরা আপনার “গাইড” (পথপ্রদর্শক), “গেটকিপার” (দারোয়ান) নন।
যে আলেম আপনাকে কোরআন বুঝতে উৎসাহিত করেন, তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করছেন। আর যে আলেম বা ব্যক্তি আপনাকে এই বলে ভয় দেখান যে, “কোরআন পড়ো না, গোমরাহ হয়ে যাবে,” তিনি হয়তো না বুঝেই আপনাকে আল্লাহর কালাম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন, যা শয়তানের কাজকে সহজ করে দেয়।
উপসংহার: আপনার রবের নামে পড়ুন
পরিশেষে বলব, সব ভয় ও দ্বিধা ঝেড়ে ফেলুন। আপনার যদি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও না থাকে, আপনি যদি আরবী একটি হরফও না চিনতে পারেন, তবুও আপনার অধিকার আছে আল্লাহর কালাম বোঝার।
আপনি আজই নিজের ভাষায় একটি নির্ভরযোগ্য কোরআনের অনুবাদ (এবং সম্ভব হলে সহজ তাফসীর) সংগ্রহ করুন। জীবনে অন্তত একবার, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, এই কিতাবটি পড়ুন। দেখুন, আল্লাহ আপনার কাছে কী চেয়েছেন।
কোরআনের প্রথম যে শব্দটি নাযিল হয়েছিল, তা ছিল “ইকরা!” (اقْرَأْ) – “পড়ুন!”
এই নির্দেশটি এমন একজন নবীর (ﷺ) প্রতি ছিল, যিনি পড়তে বা লিখতে জানতেন না (উম্মী)। আল্লাহ যদি একজন উম্মী নবীকে পড়ার নির্দেশ দিতে পারেন, তবে সেই নির্দেশ আজ আপনার এবং আমার জন্যও প্রযোজ্য।
পড়া শুরু করুন। যে আল্লাহ একজন উম্মী নবীকে (ﷺ) সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান দান করেছিলেন, সেই আল্লাহ অবশ্যই আপনার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে কবুল করবেন এবং আপনার অন্তরকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করবেন।
“আল্লাহ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)
আল্লাহ যদি আপনাকে কোরআন বোঝার সাধ্য না-ই দিতেন, তবে তিনি আপনাকে এটি নিয়ে চিন্তা করার বা এটি অনুসরণ করার নির্দেশ দিতেন না। আল্লাহর নির্দেশই প্রমাণ করে যে, আপনার সেই সাধ্য আছে।