মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: ভাষা, বর্ণ ও সৃষ্টির নিদর্শনে স্রষ্টার সন্ধান

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় ভাষা, বর্ণ ও সৃষ্টির নিদর্শনে স্রষ্টার সন্ধান
মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় ভাষা, বর্ণ ও সৃষ্টির নিদর্শনে স্রষ্টার সন্ধান

মানব মন স্বভাবগতভাবেই অনুসন্ধিৎসু। কোথা থেকে এলাম? এই সুবিশাল মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এর পেছনের কারিগরই বা কে?—এসব প্রশ্ন মানুষকে যুগ যুগ ধরে ভাবিয়েছে। দর্শন, বিজ্ঞান আর ধর্ম—প্রত্যেকেই নিজ নিজ পথে এই শ্বাশ্বত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছে। ইসলাম এই অনুসন্ধিৎসাকে স্বাগত জানায় এবং মানুষকে তার পারিপার্শ্বিক জগৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও গবেষণা করতে উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআন কোনো বিজ্ঞানের গ্রন্থ না হলেও এতে এমন সব ইঙ্গিত ও নিদর্শন ছড়িয়ে আছে, যা একজন চিন্তাশীল মানুষকে তার স্রষ্টার দিকে পথ দেখায়। এমনই এক গভীর ও ভাবসমৃদ্ধ আয়াত হলো সূরা আর-রূমের ২২ নম্বর আয়াত।

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ

অনুবাদ: “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয় এর মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শনাবলি রয়েছে।” (সূরা আর-রূম, ৩০:২২)

এই একটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর অস্তিত্ব, ক্ষমতা, প্রজ্ঞা এবং একত্বের এমন তিনটি অকাট্য দলিল পেশ করেছেন, যা একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একজন উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানী পর্যন্ত সকলকেই ভাবতে বাধ্য করে। এই প্রবন্ধে আমরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই তিনটি নিদর্শন—আসমান ও জমিনের সৃষ্টি, ভাষার বৈচিত্র্য এবং বর্ণের ভিন্নতা—এর গভীরে প্রবেশ করে বোঝার চেষ্টা করব, কীভাবে এগুলো জ্ঞানীদের জন্য স্রষ্টার পথে সুস্পষ্ট আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে।

প্রথম নিদর্শন: আসমান ও জমিনের সৃষ্টি – শক্তি ও শৃঙ্খলার মহাকাব্য

কোরআনের এই আয়াতের প্রথম অংশেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে সবচেয়ে বিশাল ও মহিমান্বিত ক্যানভাসের দিকে—আসমান ও জমিন। এটি এমন এক নিদর্শন যা প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ আমাদের চোখের সামনে উদ্ভাসিত, অথচ ব্যস্ততার আড়ালে আমরা এর মাহাত্ম্য নিয়ে ভাবার ফুরসত পাই না।

কুদরত বা মহাশক্তির প্রমাণ:

প্রথমত, এই সৃষ্টিজগতের বিশালতা আল্লাহর অসীম ক্ষমতার (কুদরত) এক নীরব সাক্ষী। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার ব্যাস প্রায় ১২,৭৪২ কিলোমিটার। অথচ এই পৃথিবী সূর্যের তুলনায় এতটাই ছোট যে, সূর্যের ভেতরে প্রায় ১৩ লক্ষ পৃথিবীকে পুরে রাখা যাবে। আমাদের সূর্য মিল্কিওয়ে নামক যে ছায়াপথে (Galaxy) অবস্থিত, সেখানে এমন নক্ষত্রের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার কোটি।

আর আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, মহাবিশ্বে এমন পর্যবেক্ষণযোগ্য গ্যালাক্সির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার কোটি। এই অকল্পনীয় বিশালতা, যা প্রতিনিয়ত আরও প্রসারিত হচ্ছে, তা কি কোনো উদ্দেশ্যহীন বিস্ফোরণের (Big Bang) ফসল হতে পারে? কোরআন এই প্রসারণের কথাই বলেছে চৌদ্দশ বছর আগে:

وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ

অনুবাদ: “আর আমি আসমানকে নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই এর প্রসারকারী।” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৪৭)

এই শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি এবং এর ক্রমাগত সম্প্রসারণ এমন এক মহাশক্তির প্রমাণ বহন করে, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এক মহাজ্ঞানী সত্তার পরিকল্পিত সৃষ্টি।

হিকমত বা প্রজ্ঞা ও শৃঙ্খলার প্রমাণ:

দ্বিতীয়ত, এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ কেবল বড়ই নয়, এটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি গ্রহ, নাক্ষত্র, গ্যালাক্সি এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতির মালার মতো নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে। আল্লাহ বলেন:

لَا الشَّمْسُ يَنبَغِي لَهَا أَن تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ ۚ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ

অনুবাদ: “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া, আর রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রম করা। আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।” (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৪০)

এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইয়াসবাহুন’ (يَسْبَحُونَ) শব্দটি সাঁতার কাটার অর্থ দেয়, যা মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের দৃষ্টিনন্দন পরিভ্রমণকে কাব্যিকভাবে তুলে ধরে। এই শৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমাদের এই পৃথিবী। প্রাণের উন্মেষ ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি উপাদান এখানে নিখুঁত পরিমাণে বিদ্যমান। সূর্য থেকে এর দূরত্ব, এর আহ্নিক ও বার্ষিক গতি, এর বায়ুমণ্ডলের স্তর, ওজন স্তরের সুরক্ষা, শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, পানিচক্র—সবকিছুই যেন জীবনের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এই বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা ‘ফাইন-টিউনড ইউনিভার্স’ (Fine-tuned Universe) বা সুসংহত মহাবিশ্ব বলে থাকেন। যদি মহাকর্ষ শক্তি বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক ধ্রুবকের মান সামান্যও এদিক-সেদিক হতো, তবে প্রাণের অস্তিত্বই থাকত না। এই নিখুঁত পরিকল্পনা কি কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে? নাকি এক মহাপ্রজ্ঞাময় সত্তার সুচিন্তিত নকশার প্রতিফলন?

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের প্রকৃতির এই নিদর্শনগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা করতে উৎসাহিত করতেন। বর্ণিত আছে, তিনি রাতে ঘুম থেকে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে সূরা আলে-ইমরানের শেষ দিকের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন, যেখানে বলা হয়েছে:

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ

অনুবাদ: “নিশ্চয় আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং দিন-রাত্রির আবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৯০)

সুতরাং, আসমান ও জমিনের সৃষ্টি একদিকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার জানান দেয়, অন্যদিকে এর ভেতরের প্রতিটি নিয়মে তাঁর গভীর প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট করে তোলে, যা একজন জ্ঞানীর জন্য স্রষ্টাকে চেনার প্রথম ও প্রধান সোপান।

দ্বিতীয় নিদর্শন: ভাষার ভিন্নতা – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐশী অনুপ্রেরণা

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তা’আলা এক ভিন্নধর্মী কিন্তু অত্যন্ত গভীর নিদর্শনের দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন—আমাদের ভাষার ভিন্নতা। এটি এমন এক নিদর্শন যা আমাদের সত্তার সাথে, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভাষার উৎস ও জটিলতা:

পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৭,০০০ এরও বেশি জীবন্ত ভাষা রয়েছে। প্রতিটি ভাষার রয়েছে নিজস্ব ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology), রূপতত্ত্ব (Morphology), বাক্যতত্ত্ব (Syntax) এবং শব্দভাণ্ডার (Lexicon)। এই ভাষাগুলো কীভাবে তৈরি হলো? আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা এর উৎপত্তি নিয়ে বহু গবেষণা করেছেন, কিন্তু কোনো একক ও অকাট্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। কোরআন আমাদের জানায়, ভাব প্রকাশের এই ক্ষমতা ও জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ দান। তিনিই প্রথম মানুষ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করে সবকিছুর নাম শিখিয়েছিলেন:

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا

অনুবাদ: “আর তিনি আদমকে সকল কিছুর নাম শিক্ষা দিলেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:৩১)

এই ‘নাম শিক্ষা’ ছিল মূলত বস্তুকে চেনা এবং তাকে একটি ধ্বনি বা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করার জ্ঞান, যা ভাষার মূল ভিত্তি। মানুষের মস্তিষ্কে ভাষা প্রক্রিয়াকরণের জন্য আল্লাহ যে জটিল স্নায়ুবিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে দিয়েছেন (যেমন: ব্রোকা’স ও ভারনিক’স এরিয়া), তা আধুনিক নিউরোসায়েন্সের এক বিস্ময়। এই জন্মগত ক্ষমতার কারণেই একটি শিশু কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তার মাতৃভাষা অনায়াসে শিখে ফেলে।

ঐক্য ও পরিচয়ের মাধ্যম:

ভাষার এই ভিন্নতা একদিকে যেমন মানবজাতিকে বিভিন্ন গোত্র ও সংস্কৃতিতে বিভক্ত করেছে, তেমনই তা মানুষের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا

অনুবাদ: “হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)

ভাষা এই পরিচিতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আমাদের বাংলা ভাষা আমাদের বাঙালি পরিচয়ের ধারক। এটি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এর সাথে মিশে আছে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, সাহিত্য, আবেগ আর ঐতিহ্য। এই যে হাজারো ভাষায় মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করছে, কবিতা লিখছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করছে—এই সৃজনশীলতার উৎস কোথায়? এই বৈচিত্র্য কি স্রষ্টার এক অপার মহিমার নিদর্শন নয়?

একই মানব প্রজাতি, একই রকম মস্তিষ্ক ও কণ্ঠস্বর নিয়েও কীভাবে এত ভিন্ন ভিন্ন ভাষার উদ্ভব হলো, তা এক অপার বিস্ময়। ইংরেজি, আরবি, ম্যান্ডারিন, বাংলা—প্রতিটি ভাষার গঠন ও প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি যেন একই হার্ডওয়্যারে চালিত হাজারো ভিন্ন ভিন্ন অপারেটিং সিস্টেম। এই ভাষাগত বৈচিত্র্য প্রমাণ করে, এর পেছনের কারিগর একঘেয়েমি পছন্দ করেন না, বরং তিনি বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার এক মহান শিল্পী। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যখন ভাষার এই জটিল ও সুন্দর জগৎ নিয়ে ভাবে, তখন সে এর পেছনে এক মহাজ্ঞানী সত্তার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।

তৃতীয় নিদর্শন: বর্ণের ভিন্নতা – একত্বের মাঝে আল্লাহর শিল্পকর্ম

আয়াতের তৃতীয় ও শেষ অংশে যে নিদর্শনটির কথা বলা হয়েছে, তা আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে কাছের ও ব্যক্তিগত—আমাদের বর্ণের ভিন্নতা। গায়ের রঙ, চুলের আকৃতি, চোখের মণি আর চেহারার গড়ে ওঠা—এই সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।

একই উৎস থেকে অপার বৈচিত্র্য:

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সকল মানুষ জিনগতভাবে ৯৯.৯% একই। মানবজাতির উৎসও এক—আফ্রিকার এক আদি মানবগোষ্ঠী। কোরআন এই একত্বের কথা বলেছে আরও স্পষ্টভাবে, সকল মানুষ একজোড়া আদি পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া) থেকে সৃষ্ট। হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“হে মানবসকল! তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। আরবের উপর অনারবের কিংবা অনারবের উপর আরবের, সাদার উপর কালোর কিংবা কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ছাড়া।” (মুসনাদে আহমাদ)

এই হাদিসটি আয়াতের মর্মকে আরও স্পষ্ট করে। আল্লাহ বলছেন, তোমাদের উৎস এক, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন বর্ণে ও আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি। এটি কোনো বিভেদ বা শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণের জন্য নয়, বরং এটি আমার একটি নিদর্শন। পৃথিবীতে আজ প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ, অথচ ফিঙ্গারপ্রিন্ট তো দূরে থাক, একজনের চেহারার সাথে অন্যজনের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি দেখতে একই রকম যমজদের মধ্যেও সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। একই পিতা-মাতার সন্তানরাও হয় ভিন্ন ভিন্ন চেহারার। এই যে একই ‘উপাদান’ (মানব প্রজাতি) থেকে এত অগণিত ও স্বতন্ত্র ডিজাইন তৈরি হচ্ছে, এটি কি আল্লাহর ‘আল-মুসাওয়ির’ (المصور) বা ‘আকৃতিদানকারী’ গুণের এক বিস্ময়কর প্রকাশ নয়?

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বার্তা:

এই আয়াতটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়—বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ঐশী ঘোষণা। আল্লাহ যখন নিজেই বলছেন যে, বর্ণের ভিন্নতা তাঁর একটি ‘নিদর্শন’ বা ‘আয়াত’, তখন এই ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে ঘৃণা বা অহংকার করার কোনো সুযোগ থাকে না। বরং এই বৈচিত্র্যকে স্রষ্টার শিল্পকর্ম হিসেবে সম্মান জানানোই ঈমানের দাবি। একজন শিল্পী যেমন একটি ক্যানভাসে বিভিন্ন রঙের ব্যবহারে ছবিকে ফুটিয়ে তোলেন, আল্লাহ তা’আলাও তেমনি মানবজাতিকে বিভিন্ন বর্ণে রঙিন করে এই পৃথিবীকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। সাদা, কালো, বাদামি, শ্যামবর্ণ—সবই তাঁর সৃষ্টি, সবই তাঁর নিদর্শন।

একজন জীববিজ্ঞানী বা জিনতত্ত্ববিদ যখন গবেষণা করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে, মানুষের গায়ের রঙ নিয়ন্ত্রণ করে মেলানিন নামক এক রাসায়নিক পদার্থ। ভৌগোলিক অবস্থান ও সূর্যরশ্মির তীব্রতার সাথে এর উৎপাদনের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু একজন জ্ঞানী মু’মিন এর চেয়েও গভীরে প্রবেশ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, এই মেলানিন কে তৈরি করলো? এই জিনগত কোড কে লিখে দিলেন? প্রকৃতির এই নিয়মই বা কে তৈরি করলেন? তখন তার জ্ঞান তাকে উত্তর দেয়—এক মহাবিজ্ঞানী ও শিল্পী স্রষ্টা, যিনি একই সাথে কারণ ও তার পেছনের মূল কারণেরও স্রষ্টা।

উপসংহার: জ্ঞানীদের জন্য আহ্বান

সূরা আর-রূমের এই মহিমান্বিত আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় এর মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শনাবলি রয়েছে।” এখানে ‘আলিমীন’ (الْعَالِمِينَ) বা জ্ঞানী বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? এর দ্বারা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী বিজ্ঞানী, দার্শনিক বা পণ্ডিতদের বোঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে প্রত্যেক চিন্তাশীল, অনুসন্ধিৎসু ও মুক্তমনা ব্যক্তিকে, যারা জগৎকে কেবল স্থূল দৃষ্টিতে দেখে না, বরং প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে তার স্রষ্টার স্বাক্ষর খোঁজে।

  • একজন সাধারণ মানুষ আকাশকে একটি নীল চাদর হিসেবে দেখে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি এর পেছনে লুকিয়ে থাকা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র, সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব এবং এর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভেবে স্রষ্টার ক্ষমতার কথা স্মরণ করে।
  • একজন সাধারণ মানুষ অন্য ভাষার মানুষকে ভিনদেশি হিসেবে দেখে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি ভাষার বৈচিত্র্য ও জটিলতার পেছনে স্রষ্টার সৃজনশীলতা ও প্রজ্ঞার নিদর্শন খুঁজে পায়।
  • একজন বর্ণবাদী ব্যক্তি গায়ের রঙ দিয়ে মানুষের বিচার করে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বর্ণের ভিন্নতার মাঝে স্রষ্টার শিল্পকর্ম ও একত্বের বার্তা খুঁজে পায় এবং সকল মানুষকে সম্মান করে।

সুতরাং, এই আয়াতটি আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য একটি ঐশী আহ্বান। এটি আমাদের শেখায় যে, স্রষ্টাকে খোঁজার জন্য দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের মাথার উপরের সুবিশাল আকাশ, আমাদের পায়ের নিচের এই পৃথিবী, আমাদের মুখের ভাষা আর আমাদের নিজেদের চেহারা—এই সবকিছুই তাঁর অস্তিত্বের জীবন্ত ও সুস্পষ্ট প্রমাণ। বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, এই আয়াতগুলোর মর্মার্থও তত নতুন মাত্রায় উন্মোচিত হচ্ছে। তাই একজন মু’মিনের পথ হলো জ্ঞানার্জন ও চিন্তাশীলতার পথ। যে যত বেশি জ্ঞানার্জন করবে এবং সৃষ্টি নিয়ে ভাববে, সে তত বেশি করে তার স্রষ্টার মহত্ত্ব ও প্রজ্ঞার সামনে নিজেকে সমর্পণ করতে শিখবে। আর এটাই হলো ইসলামের মূল বার্তা—জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে স্রষ্টাকে চেনা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top