আমি একজন নাস্তিক হিসেবে বড় হয়েছি। একটি একাডেমিক মেডিকেল স্কুলে পড়াশোনা করেছি, সফল ছিলাম, ভালো উপার্জন করতাম এবং জীবন নিয়ে পুরোপুরি সুখী ছিলাম। কিন্তু সব বদলে গেল আমার মেয়ের জন্মের পর। তার জন্মগত হৃদরোগ ছিল, তার শরীরের নিচের অংশ অক্সিজেন না পাওয়ায় নিথর হয়ে যাচ্ছিলো। ডাক্তাররা আমাকে রুম থেকে বের করে দিলেন। নিরুপায় হয়ে আমি সোজা হাসপাতালের প্রার্থনা কক্ষে গেলাম এবং বললাম, “হে স্রষ্টা, যদি আপনি থেকেই থাকেন, তাহলে আমাকে সাহায্য করুন। আপনি যদি আমার মেয়েকে রক্ষা করেন, তাহলে আমি আপনাকে অনুসরণ করব।”
এরপর আমি সকল ধর্ম সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করলাম—তাওবাদ, বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দু ধর্ম। আমার ভাই আমাকে কুরআনের একটি অনুবাদ পাঠিয়েছিল, আর যখন আমি সেটা পড়লাম, সাথে সাথেই সব বুঝতে পারলাম।
কিন্তু এই বিশ্বাসের পথ সহজ ছিল না। ইসলাম গ্রহণের পর আমার স্ত্রী ১৪ বছরের সংসার ছেড়ে আমাকে তালাক দিল। আমার মা এবং বাবা আমাকে পরিত্যাগ করলেন, বললেন, “আমার ঘর থেকে বের হও আর কখনো ফিরে আসবে না!”
এরপরেই এক রাতে আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। আমি নবী (সাঃ) এর সান্নিধ্যে ছিলাম এবং তিনি পাহাড়ের দিকে ইশারা করে বললেন, “পাহাড়ে যাও।” এই স্বপ্নই আমার জীবনকে এক নতুন পথে চালিত করলো।
কথোপকথন
সাক্ষাৎকারক: আসসালামু আলাইকুম, ড. লরেন্স ব্রাউন। আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনাকে আমাদের সাথে পেয়ে আমরা খুব খুশি।
ড. লরেন্স ব্রাউন: ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সাক্ষাৎকারক: আমি শুরু করতে চাই এই প্রশ্ন দিয়ে, ড. লরেন্স ব্রাউন কে? আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলবেন?
ড. লরেন্স ব্রাউন: আমি একজন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং একজন লেখক। বর্তমানে আমি সৌদি আরবে বাস করছি এবং সেখানেই কাজ করছি। আমি এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলাম যারা ছিল কোয়েকার (খ্রিস্ট ধর্মের একটি প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়), কিন্তু তারা ধর্ম পালন করত না। আমি প্রায় ৩০ বছর আগে মুসলিম হয়েছি, যা আমাকে সৌদি আরবে নিয়ে আসে এবং তখন থেকেই আমি এখানে বসবাস ও কাজ করছি।
বিশ্বাসহীনতার জীবন
সাক্ষাৎকারক: ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে আপনার জীবন কেমন ছিল? আপনি কী বিশ্বাস করতেন?
ড. লরেন্স ব্রাউন: আমি নাস্তিক হিসেবে বড় হয়েছি। আমি সান ফ্রান্সিসকোতে জন্মগ্রহণ করি এবং সেখানেই আমার বেড়ে ওঠা। আমি একাডেমিক হাই স্কুল, কলেজ এবং মেডিকেল স্কুলে পড়াশোনা করেছি। এই সমস্ত একাডেমিক পরিবেশে আমার অধিকাংশ শিক্ষক, সহকর্মী এবং সহপাঠীরা নাস্তিক ছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এটাই যেন একটা স্বাভাবিক বিশ্বাস হিসেবে ধরে নেওয়া হতো যে, স্রষ্টার অস্তিত্বকে যুক্তির মাধ্যমে অস্বীকার করতে হবে। আমার একটি আধ্যাত্মিক জাগরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত এটাই আমার বিশ্বাস ছিল।
জীবনের মোড় ঘুরানো সেই ঘটনা
সাক্ষাৎকারক: কোন বিষয়টি আপনাকে আপনার বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে এবং এই যাত্রা শুরু করতে বাধ্য করল?
ড. লরেন্স ব্রাউন: আমি একজন সফল চক্ষু বিশেষজ্ঞ ছিলাম, ভালো উপার্জন করছিলাম এবং জীবন নিয়ে বেশ খুশি ছিলাম। কিন্তু তবুও আমার মনে হতো, জীবনে নিশ্চয়ই এর চেয়েও বড় কিছু থাকার কথা। আমার জন্য আসল উপলব্ধি তখন এসেছিল যখন আমার একটি মেয়ে জন্ম নেয়, যার জন্মগতভাবে হৃদযন্ত্রের প্রধান ধমনীতে (মহাধমনী) একটি সমস্যা ছিল। জন্মের সময় তার মহাধমনী সংকীর্ণ থাকার কারণে শরীরের নিচের অংশ ধূসর নীল হয়ে গিয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিল তার শরীর মারা যাচ্ছে, কারণ সেখানে কোনো অক্সিজেন পৌঁছাচ্ছিল না।
একজন ডাক্তার হিসেবে এই দৃশ্য দেখা আমার জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর ছিল। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি নাস্তিক থাকলেও ধীরে ধীরে আমি একজন স্রষ্টার উপস্থিতি অনুভব করতে শুরু করি। জীবনে প্রথমবারের মতো আমি এমন এক পরিস্থিতিতে ছিলাম, যেখানে আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমি বুঝতে পারলাম, আমার মেয়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারব না। একমাত্র আমার সৃষ্টিকর্তাই এই শিশুটিকে বাঁচাতে পারেন।
ডাক্তাররা আমাকে রুম থেকে বের করে দিলেন। আমি সোজা হাসপাতালের প্রার্থনা কক্ষে গেলাম এবং খুব সহজ একটি প্রার্থনা করলাম। আমি বললাম, “হে স্রষ্টা, যদি তুমি থাকো, আমার সাহায্য দরকার। আপনি যদি আমার সন্তানকে বাঁচান, তবে আমাকে সেই ধর্মের পথ দেখান যা আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমি তা অনুসরণ করব।”
প্রায় ১০-১৫ মিনিট পর আমি আইসিইউতে ফিরে গেলাম। যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওথোরাসিক সার্জন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও এখন সুস্থ হয়ে যাবে।”
আমার মেয়ে হান্না সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। তার কোনো ওষুধ লাগেনি, কোনো অস্ত্রোপচার লাগেনি, কোনো চিকিৎসাই লাগেনি। আপনি এটাকে একটা অলৌকিক ঘটনা বলতে পারেন, কিন্তু আমার জন্য এটা স্পষ্ট ছিল যে আমি আমার স্রষ্টার সাথে একটি ওয়াদা করেছি।
সত্যের সন্ধানে দীর্ঘ যাত্রা
সাক্ষাৎকারক: এরপর আপনার যাত্রা কেমন ছিল?
ড. লরেন্স ব্রাউন: এরপর চার-পাঁচ বছর আমার জন্য এক ভয়ানক মানসিক কষ্টের সময় ছিল, কারণ আমি আল্লাহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই ধর্মটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি তাওবাদ, বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দু ধর্ম—সবকিছু নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছি। অবশেষে আমি বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়া শুরু করলাম। আমি এর অনেক শিক্ষার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারলাম, কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্ট তিনজন নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করে। আমার মনে প্রশ্ন জাগল, এই তৃতীয় নবী কোথায়?
বাইবেলে “পারাক্লিটোস” শব্দটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, যা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটি নাম ‘আহমদ’-এর অনুবাদ হতে পারে। যখন আমি বুঝলাম যে একজন শেষ নবী আছেন, তখন আমার হৃদয়ে বিশ্বাস দৃঢ় হলো। কিন্তু খ্রিস্ট ধর্মের ত্রিত্ববাদ (তিনজন এক এবং একজন তিনজন) এবং যীশুকে স্রষ্টার পুত্র ভাবার ধারণাটি আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। যীশু বাইবেলে নিজেকে ৮৮ বার ‘মানবপুত্র’ বলেছেন, একবারও নিজেকে স্রষ্টার পুত্র বলেননি।
এরপর আমার ভাই, যে আমার আগেই মুসলিম হয়েছিল, আমাকে কুরআনের একটি অনুবাদ এবং নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটি জীবনী (সীরাত) পাঠায়। যখন আমি সেগুলো পড়লাম, সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। এটা যেন একটা অসম্পূর্ণ পাজলের মতো ছিল, যার হারিয়ে যাওয়া অংশগুলো খুঁজে পাওয়ার পর পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারলাম, তিনিই শেষ নবী এবং এটাই চূড়ান্ত ওহী। আর তখনই আমি মুসলিম হলাম।
ইসলামের সুশীতল ছায়ায়
সাক্ষাৎকারক: ইসলাম গ্রহণের পর আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
ড. লরেন্স ব্রাউন: আমার মূল অনুভূতি ছিল শান্তি। আমি অনেক বেশি শান্ত এবং নিরুদ্বেগ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি মনে করতে পারি, যখন আমি ওযু করতাম, অনুভব করতাম যে এটি একটি মন প্রশান্ত করার প্রক্রিয়া। নামাজের পূর্বে ওযু করা আত্মশুদ্ধির একটি অসাধারণ মাধ্যম এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটা ছিল প্রচণ্ড রকমের প্রশান্তিদায়ক।
ইসলাম গ্রহণের পরের কঠিন পরীক্ষা
সাক্ষাৎকারক: আপনার ইসলাম গ্রহণের পর পরিবার এবং আশেপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
ড. লরেন্স ব্রাউন: এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। আমার স্ত্রী ১৪ বছরের সংসার ছেড়ে আমাকে তালাক দিল। আমি আমার সন্তানদেরও হারালাম, কারণ আমি মুসলিম হওয়ায় আদালত তাদের আমার স্ত্রীর কাছে দিয়ে দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটা ছিল অত্যন্ত অপমানজনক। বিচারক শুধুমাত্র আমি মুসলিম, এই কারণে আমার নিজের বাড়ি এবং সন্তানদের ১০০ ফুটের মধ্যে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।
আমি আমার বাড়ি, স্ত্রী, সন্তান, গাড়ি, সম্পত্তি—সবকিছু হারিয়েছি। আমার মা এবং বাবা আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে পরিত্যাগ করেন। তারা লেখেন, “বাড়িতে আসবে না, কল করবে না, কোনো চিঠিও দেবে না। আমরা তোমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ চাই না।”
তবে এই গল্পের ভালো দিক হলো, অনেক বছর পর আমাদের আবার যোগাযোগ হয়। মৃত্যুর আগে আমার বাবা-মা দুজনেই আলাদাভাবে শাহাদাহ পাঠ করেছিলেন। আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে তিনি তাদের কবুল করবেন।
স্বপ্নে রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশনা
সাক্ষাৎকারক: আমরা শুনেছি আপনি মদিনায় থাকেন, যা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ)–এর শহর। আপনি কি কখনও তাঁকে স্বপ্নে দেখেছেন?
ড. লরেন্স ব্রাউন: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) জী, আলহামদুলিল্লাহ, আমি দেখেছি। এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সামনে উপস্থিত। তিনি পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “পাহাড়ের দিকে যাও। পাহাড়ের মানুষের কাছে যাও, কারণ সেখানে জিহাদ রয়েছে।” আমি তাঁকে আমার স্ত্রী-সন্তানের কথা বললে তিনি বলেন, “আমি তোমার স্ত্রী ও সন্তানের দেখাশোনা করব।”
এই স্বপ্নের পরই আমি মদিনায় চলে আসি। ২৬ বছর হয়ে গেছে, আমি এখনো মদিনায় আছি। একদিন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উহুদ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম, এটাই স্বপ্নে দেখা সেই পাহাড় এবং মদিনার মানুষই হলো ‘পাহাড়ের মানুষ’।
স্বপ্নের দ্বিতীয় অংশটিও পূরণ হয়েছে। অনেক বছর পর আমার মেয়ে যখন আমেরিকায় কলেজে পড়তে যায়, তখন আমার ফিলিস্তিনি স্ত্রী তার সাথে ছিল। আমার স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে উবারে যাতায়াত করতে ভয় পেত। একদিন সে স্বপ্নে দেখল, উবারের ড্রাইভারের আসনে স্বয়ং মুহাম্মদ (সাঃ) বসে আছেন এবং তিনি দরজা খুলে দিচ্ছেন। আমার স্ত্রী আমাকে ফোন করে বলল, “তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। মুহাম্মদ (সাঃ) আমার এবং মেয়ের দেখাশোনা করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন।”
একজন ডাক্তারের চোখে সৃষ্টিজগতের বিস্ময়
সাক্ষাৎকারক: আপনার পেশা অনুযায়ী মানবদেহের সবচেয়ে আশ্চর্য জিনিস কোনটি, যা আল্লাহর অসাধারণ সৃষ্টিকে প্রমাণ করে?
ড. লরেন্স ব্রাউন: মুসলিম হওয়ার আগে, মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়া কিছু মানুষের অভিজ্ঞতা আমাকে প্রভাবিত করেছিল। তারা তাদের শরীর থেকে বের হয়ে নিজেদের উপর থেকে দেখতে পায়। একজন ডাক্তার হিসেবে এর কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিল না, কিন্তু এটা আমাকে আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। তাই আমি বলব, আমাদের শরীরের সবচেয়ে অলৌকিক এবং সুন্দর জিনিস হলো আমাদের রূহ বা আত্মা।
আর আরেকটি বিষয় হলো জীবন। নাস্তিকতা বিগ ব্যাং বা বিবর্তনবাদ দিয়ে জীবনের ভৌত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও, তারা একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না—জীবনের উৎপত্তি কোথা থেকে হলো? আল্লাহ অবিশ্বাসীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “একটি মৃতদেহ নাও, আর তাকে আবার জীবিত করো।” মানুষ তা পারেনি এবং পারবেও না। জীবন কোথা থেকে আসে? এর উত্তর একমাত্র স্রষ্টাই জানেন।