
মহাগ্রন্থ আল-কোরআন হলো বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী গ্রন্থ। এটি কোনো সাধারণ বইয়ের মতো একবারে রচিত বা অবতীর্ণ হয়নি। বরং এক বিশেষ ও বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উপর এটি অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআন অবতরণের এই প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং এর প্রতিটি ধাপ ছিল সুপরিকল্পিত। কোরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে আমরা এই অবতরণকে প্রধানত দুটি পর্যায়ে এবং একাধিক পদ্ধতিতে বিভক্ত করতে পারি।
প্রথম পর্যায়: লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে এককালীন অবতরণ
কোরআন অবতরণের প্রথম পর্যায়টি ছিল এককালীন এবং এটি সংঘটিত হয়েছিল পৃথিবীর বাইরে, আসমানী জগতে। অধিকাংশ ইসলামিক স্কলারদের মতে, মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনকে প্রথমে ‘লাওহে মাহফুজ’ (সংরক্ষিত ফলক) থেকে একবারে প্রথম আসমানের ‘বায়তুল ইজ্জাহ’ (সম্মানের ঘর) নামক স্থানে অবতীর্ণ করেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রাতে, যা ‘লাইলাতুল কদর’ নামে পরিচিত। এই রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“নিশ্চয়ই আমি এটি (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে (লাইলাতুল কদর)।”
(সূরা আল-কদর, ৯৭:১)
অন্য একটি আয়াতে এই রাতকে ‘বরকতময় রাত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:
“হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। নিশ্চয়ই আমি এটি এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।”
(সূরা আদ-দুখান, ৪৪:১-৩)
বিখ্যাত সাহাবী ও কোরআনের ব্যাখ্যাকার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই দুই ধাপের অবতরণের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “কোরআনকে একবারে দুনিয়ার আকাশে (বায়তুল ইজ্জাহ) লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ করা হয়। অতঃপর আল্লাহ যখন যা ইচ্ছা করতেন, জিব্রাইল (আঃ) তা নিয়ে নবী (সাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হতেন।” (তাফসীরে তাবারী, মুসতাদরাকে হাকিম)।
দ্বিতীয় পর্যায়: প্রয়োজন অনুসারে ধীরে ধীরে নবী (সাঃ)-এর উপর অবতরণ
‘বায়তুল ইজ্জাহ’ থেকে কোরআন নবী করীম (সাঃ)-এর উপর একবারে নাযিল হয়নি। বরং নবুয়তের ২৩ বছরের সুদীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ঘটনা, প্রেক্ষাপট, প্রশ্ন এবং প্রয়োজনের আলোকে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআন এভাবে ধীরে ধীরে নাযিলের পেছনে অনেক হিকমত ও প্রজ্ঞা নিহিত ছিল। কাফিরদের একটি প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ নিজেই এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন:
“কাফিররা বলে, তাঁর উপর সমগ্র কোরআন একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? আমি এভাবেই (অল্প অল্প করে) অবতীর্ণ করেছি আপনার হৃদয়কে শক্তিশালী করার জন্য এবং আমি তা পর্যায়ক্রমে তেলাওয়াত করেছি।”
(সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩২)
এই ধারাবাহিক অবতরণ নবী (সাঃ) ও সাহাবীদের জন্য কোরআন বোঝা, মুখস্থ করা এবং এর বিধানাবলী জীবনে বাস্তবায়ন করাকে সহজ করে দিয়েছিল। আল্লাহ আরও বলেন:
“আমি কোরআনকে পৃথক পৃথকভাবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি তা মানুষের কাছে ক্রমে ক্রমে পাঠ করতে পারেন এবং আমি তা যথাযথভাবে নাযিল করেছি।”
(সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:১০৬)
ওহী অবতরণের বিভিন্ন পদ্ধতি
জিব্রাইল (আঃ) যখন নবী (সাঃ)-এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন, তখন পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী এর বিভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হতো। হাদিসে এই পদ্ধতিগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
১. ঘণ্টার ধ্বনির ন্যায়: ওহী লাভের এই পদ্ধতিটি ছিল সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টদায়ক। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হারেস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর ওহী কীভাবে আসে?’ তিনি উত্তরে বলেন:
“কখনো কখনো তা আমার কাছে ঘণ্টার ধ্বনির মতো আসে এবং এটিই আমার উপর সবচেয়ে কঠিন হয়। যখন তা শেষ হয়, তখন তিনি (ফেরেশতা) যা বলেছেন তা আমি মুখস্থ করে ফেলি।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২)
এই অবস্থায় প্রচণ্ড শীতের দিনেও নবী (সাঃ)-এর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকত এবং তাঁর উপর এতটাই শারীরিক ও মানসিক চাপ পড়ত যে, তিনি উটের উপর থাকা অবস্থায় ওহী আসলে উটটি পর্যন্ত ভারে বসে পড়ত।
২. ফেরেশতার মানব আকৃতিতে আগমন: কখনো কখনো হযরত জিব্রাইল (আঃ) একজন মানুষের রূপ ধরে নবী (সাঃ)-এর কাছে আসতেন। এটি ছিল ওহী লাভের তুলনামূলক সহজ পদ্ধতি। আয়েশা (রাঃ)-এর বর্ণনার পরের অংশে রাসূল (সাঃ) বলেন:
“আবার কখনো ফেরেশতা একজন পুরুষের আকৃতিতে আমার কাছে আসেন এবং আমার সাথে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নিই।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২)
অধিকাংশ সময় তিনি সাহাবী দাহইয়াতুল কালবী (রাঃ)-এর আকৃতিতে আসতেন। বিখ্যাত ‘হাদিসে জিব্রাইল’-এ তিনি একজন অপরিচিত সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তির রূপে এসেছিলেন, যাকে সাহাবীরাও দেখেছিলেন।
৩. সত্য স্বপ্ন (আর-রু’ইয়া আস-সাদিকাহ): নবুয়তের একেবারে শুরুতে ওহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। নবী (সাঃ) স্বপ্নে যা দেখতেন, পরদিন সকালে তা দিনের আলোর মতো বাস্তবে পরিণত হতো। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন:
“রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি ওহীর সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা ভোরের আলোর মতো সুস্পষ্টভাবে সত্যে পরিণত হতো।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩)
৪. অন্তরে নিক্ষেপ করা: কোনো আকৃতি ধারণ না করে বা শব্দ না শুনে সরাসরি নবী (সাঃ)-এর অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বাণী বা ভাব স্থাপন করা হতো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
“পবিত্র আত্মা (জিব্রাইল) আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো আত্মা তার রিযিক পরিপূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না।”
(মুসতাদরাকে হাকিম)
৫. ফেরেশতার নিজ আকৃতিতে আগমন: রাসূল (সাঃ) তাঁর জীবনে মাত্র দুইবার হযরত জিব্রাইল (আঃ)-কে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখেছেন। তাঁর ছিল ছয়শত ডানা, যা আসমানের দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত ছিল। এই দর্শন ছিল এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। এর বর্ণনা সূরা আন-নাজম-এ এসেছে:
“অবশ্যই তিনি তাকে (জিব্রাইলকে) আরেকবার দেখেছিলেন, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।”
(সূরা আন-নাজম, ৫৩:১৩-১৪)
পরিশেষে বলা যায়, কোরআন অবতরণের প্রক্রিয়াটি ছিল এক মহিমান্বিত ও সুশৃঙ্খল ঐশী ব্যবস্থাপনার অংশ। এর প্রতিটি ধাপ ও পদ্ধতি প্রমাণ করে যে, এটি কোনো মানব রচিত গ্রন্থ নয়, বরং এটি জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক জীবন্ত মু’জিযা, যা মানবজাতির পথপ্রদর্শনের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।