
আধুনিক বিশ্ব এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার মঞ্চ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ এক অকল্পনীয় দৌড়ে শামিল। শৈশব, যা ছিল ফুলের মতো পবিত্র ও নিষ্পাপ, আজ তা-ও এই প্রতিযোগিতার করাল গ্রাস থেকে মুক্ত নয়। সেরা স্কুল, সর্বোচ্চ নম্বর, দামি খেলনা, ব্র্যান্ডের পোশাক, নিত্যনতুন প্রযুক্তি—এইসবের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শিশুদের মনোজগতে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে। এর ফলে তাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হিংসা, হতাশা, অতৃপ্তি এবং মানসিক অস্থিরতা। কোমলমতি শিশুরা তাদের শৈশবের আনন্দ হারিয়ে ফেলছে এক তীব্র চাপের মধ্যে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ইসলাম মানবজাতির জন্য এক শ্বাশ্বত আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখায়। ইসলামি জীবনবিধান এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে সন্তানদের রক্ষা করার জন্য এক কালজয়ী ও কার্যকর রূপরেখা প্রদান করে। এর মূল প্রতিষেধক হলো তিনটি মহৎ গুণ, যা শৈশব থেকেই সন্তানের অন্তরে রোপণ করা অপরিহার্য: কানা’আত (অল্পে তুষ্টি), দানশীলতা (শেয়ারিং বা অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া) এবং শুকর (কৃতজ্ঞতা)। এই তিনটি গুণই একটি শিশুকে পার্থিব মোহ থেকে মুক্ত করে এক প্রশান্তিময় ও সফল জীবনের দিকে পরিচালিত করতে পারে। নিম্নে কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়গুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথম অধ্যায়: অসুস্থ প্রতিযোগিতার স্বরূপ ও তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
ইসলামে প্রতিযোগিতা মাত্রই নিন্দনীয় নয়। সৎকাজে প্রতিযোগিতা, বা ‘ফাসতাবিকুল খাইরাত’ (কল্যাণের কাজে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করো), কোরআনের একটি বহুল প্রশংসিত ধারণা। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“অতএব তোমরা সৎকাজের দিকে ধাবিত হও।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪৮)
এই ধরনের প্রতিযোগিতা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে উৎসাহিত করে, যেমন—ইবাদত, জ্ঞানার্জন, মানবসেবা ইত্যাদি। কিন্তু যখন প্রতিযোগিতা হয় দুনিয়াবি বা পার্থিব বিষয়কে কেন্দ্র করে, তখন তা হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক। অন্যের চেয়ে ভালো বাড়ি, ভালো গাড়ি, বেশি সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদার জন্য যে প্রতিযোগিতা, তা মানুষের অন্তর থেকে শান্তি কেড়ে নেয় এবং সেখানে হিংসা, লোভ ও অহংকারের জন্ম দেয়।
শিশুদের উপর এর প্রভাব আরও মারাত্মক। যখন একজন শিশুকে ক্রমাগত তার সহপাঠী বা অন্য কারো সাথে তুলনা করা হয়, তখন তার আত্মমর্যাদা চূর্ণ হয়ে যায়। সে নিজেকে অন্যের চেয়ে ছোট বা অযোগ্য ভাবতে শুরু করে। তার মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। সে ভাবতে থাকে, তার মূল্য নির্ভর করছে তার অর্জন বা ফলাফলের উপর, তার মানবিক গুণাবলির উপর নয়। এই মানসিক চাপ থেকে জন্মায় উদ্বেগ (Anxiety), বিষণ্ণতা (Depression) এবং আচরণগত সমস্যা। সে পড়াশোনা বা অন্য কোনো কাজকে আনন্দের সাথে গ্রহণ না করে একটি বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শিশুদেরকে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। সে নিজের জিনিস অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে চায় না, কারণ সে সবসময় অন্যকে তার প্রতিযোগী হিসেবে দেখে। এই মানসিকতা একটি সুস্থ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনে বড় অন্তরায়।
দ্বিতীয় অধ্যায়: কানা’আত (অল্পে তুষ্টি) – অন্তরের ঐশ্বর্য
‘কানা’আত’ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো অল্পে তুষ্টি, যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। এটি ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা এবং মানসিক শান্তির প্রধানতম উৎস। যার অন্তরে কানা’আত আছে, পার্থিব কোনো অভাব বা অন্যের প্রাচুর্য তাকে অস্থির করতে পারে না। সে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে এবং একটি প্রশান্ত জীবনযাপন করে।
কোরআনের আলোকে কানা’আত:
পবিত্র কোরআন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী বান্দাদের মধ্যে রিযিক বণ্টন করেন। কারো রিযিক প্রশস্ত করেন, আবার কারো সংকীর্ণ করেন। এর পেছনে নিগূঢ় রহস্য রয়েছে যা একমাত্র তিনিই জানেন। তাই অন্যের প্রাচুর্য দেখে হিংসা বা আফসোস করা মুমিনের কাজ নয়। আল্লাহ বলেন:
“এবং তোমরা এমন বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা করো না, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩২)
এই আয়াতটি আমাদের স্পষ্টভাবে শিক্ষা দিচ্ছে যে, অন্যের প্রাপ্তি দেখে আকাঙ্ক্ষা করার পরিবর্তে নিজের যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থেকে আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করা উচিত। আল্লাহ আরও বলেন:
“পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য স্বরূপ আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনো তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না। আমি তা দিয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করি। আর তোমার রবের দেওয়া রিযিকই উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।” (সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১৩১)
এই আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করে সমগ্র মানবজাতিকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী এবং পরীক্ষার বস্তু। এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া মানে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হওয়া।
হাদিসের আলোকে কানা’আত:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অল্পে তুষ্টির মূর্ত প্রতীক। তাঁর জীবন ছিল অনাড়ম্বর ও সাদাসিধে। তিনি ইচ্ছা করলেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন, কিন্তু তিনি আখিরাতের জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
“প্রকৃত ঐশ্বর্য ধন-সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, বরং প্রকৃত ঐশ্বর্য হলো অন্তরের ঐশ্বর্য (অল্পে তুষ্টি)।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৪৬)
এই হাদিসটি একটি গভীর সত্যকে উন্মোচিত করে। মানুষ যতই সম্পদ অর্জন করুক না কেন, তার অন্তরে যদি তৃপ্তি না থাকে, তবে সে চিরকাল দরিদ্রই থেকে যাবে। তার ‘আরও চাই’ এই আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হবে না। অন্যদিকে, যার অন্তর তুষ্ট, সে সামান্য সম্পদেও একজন বাদশাহর মতো পরিতৃপ্ত জীবনযাপন করতে পারে।
অন্য এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন:
“সেই ব্যক্তিই সফলকাম, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, যাকে প্রয়োজন পরিমাণ (কাফাফ) রিযিক দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন, তাতে সে তুষ্ট (কানা’আত) থেকেছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫৪)
সন্তানের অন্তরে কানা’আত রোপণের উপায়:
১. পিতামাতার আদর্শ: সন্তানরা সবচেয়ে বেশি শেখে তাদের পিতামাতাকে দেখে। পিতামাতা যদি নিজেরা সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেন, অন্যের প্রাচুর্য নিয়ে আলোচনা বা আফসোস না করেন, তাহলে সন্তানরাও অল্পে তুষ্ট থাকতে শিখবে।
২. তুলনা পরিহার: সন্তানদের কখনোই অন্য শিশুদের সাথে, বিশেষ করে পড়ালেখা, ফলাফল বা বস্তুগত জিনিসের ক্ষেত্রে তুলনা করা যাবে না। “দেখো, ও কত ভালো রেজাল্ট করেছে” বা “ওর বাবার কত সুন্দর গাড়ি আছে”—এই ধরনের কথা সন্তানের মনে হীনম্মন্যতা ও হিংসার বীজ বপন করে। বরং তার নিজস্ব যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রশংসা করতে হবে।
৩. “না” বলতে শেখা: সন্তানের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মাঝে মাঝে তার কোনো চাওয়া অপূর্ণ থাকলে সে বুঝতে শিখবে যে, জীবনের সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না। এতে তার মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা তৈরি হবে।
৪. ইসলামি জ্ঞান দান: সন্তানদের নবী-রাসূল ও সাহাবীদের জীবনকাহিনী শোনাতে হবে। তাঁরা কত অল্প উপকরণ নিয়ে জীবনযাপন করতেন এবং আল্লাহর প্রতি কত সন্তুষ্ট থাকতেন, সেই গল্পগুলো তাদের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলবে।
তৃতীয় অধ্যায়: দানশীলতা (শেয়ারিং) – ত্যাগের মহিমা
দানশীলতা ও শেয়ারিং বা অন্যের সাথে নিজের সম্পদ ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা হলো স্বার্থপরতা ও লোভের বিপরীত। যে ব্যক্তি অন্যকে দিতে শেখে, তার অন্তর সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়। সে বস্তুগত জিনিসের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা অনুভব করে। এই গুণটি শিশুদেরকে সামাজিক ও সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
কোরআনের আলোকে দানশীলতা:
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা অসংখ্যবার দান ও সদকার কথা বলেছেন এবং দানশীল ব্যক্তিকে নিজের বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন:
“যারা নিজেদের ধন-সম্পদ রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তাদের প্রতিদান তাদের রবের নিকট রয়েছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৪)
ইসলামে ত্যাগের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো ‘ঈসার’ (الإيثار), অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মদিনার আনসার সাহাবীরা মুহাজিরদের জন্য যে ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, আল্লাহ তার প্রশংসা করে বলেন:
“এবং তারা (আনসারগণ) নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের উপর তাদেরকে (মুহাজিরদের) অগ্রাধিকার দেয়। আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই মূলত সফলকাম।” (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৯)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত সফলতা ভোগে নয়, বরং ত্যাগে। এই মানসিকতা শিশুদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতার আকাঙ্ক্ষাকে মূল থেকে উৎপাটন করে দেয়।
হাদিসের আলোকে দানশীলতা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তাঁর কাছে কেউ কিছু চেয়ে খালি হাতে ফিরে যায়নি। তিনি বলেছেন:
“দান করলে সম্পদ কমে না, বরং আল্লাহ দানকারীর সম্মান বৃদ্ধি করে দেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)
তিনি আরও বলেছেন:
“উপরের হাত (দানকারীর হাত) নিচের হাত (গ্রহণকারীর হাত) থেকে উত্তম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪২৯)
এই হাদিসগুলো শিশুদের মনে দান ও শেয়ারিং-এর প্রতি এক ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। তারা বুঝতে শেখে যে, দেওয়ার মাধ্যমে মানুষ ছোট হয় না, বরং মহান হয়।
সন্তানের অন্তরে দানশীলতা রোপণের উপায়:
১. ছোটবেলা থেকে অভ্যাস: শিশুদেরকে তাদের খেলনা, খাবার বা পছন্দের জিনিসপত্র ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব বা গরীব শিশুদের সাথে ভাগ করে নিতে উৎসাহিত করতে হবে। এর জন্য তাদের প্রশংসা করতে হবে।
২. পিতামাতার অংশগ্রহণ: পিতামাতা যখন নিজেরা আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা অভাবী মানুষদের সাহায্য করবে এবং সন্তানকে এই প্রক্রিয়ায় সাথে রাখবে, তখন তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এই গুণটি তৈরি হবে। যেমন—ঈদের সময় গরীবদের জন্য যাকাত বা উপহার কেনার সময় সন্তানকে সাথে নেওয়া।
৩. দানবাক্সের ব্যবহার: বাড়িতে একটি দানবাক্স রাখা যেতে পারে যেখানে পরিবারের সবাই প্রতিদিন অল্প কিছু হলেও জমা করবে। মাস শেষে সেই অর্থ কোনো ভালো কাজে বা অভাবী কাউকে দেওয়ার সময় সন্তানকে সঙ্গে রাখলে সে দানের গুরুত্ব হাতে-কলমে শিখবে।
৪. শেয়ারিং-এর আনন্দ: সন্তান যখন তার কোনো জিনিস অন্যের সাথে শেয়ার করবে, তখন তাকে বোঝাতে হবে যে এর মাধ্যমে সে শুধু অন্যকে খুশিই করছে না, বরং আল্লাহকেও খুশি করছে এবং এতে তার নিজের সম্পদেও বরকত হবে।
চতুর্থ অধ্যায়: শুকর (কৃতজ্ঞতা) – প্রশান্তির চাবিকাঠি
‘শুকর’ বা কৃতজ্ঞতা হলো আল্লাহ তা’আলার দেওয়া অগণিত নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেই নিয়ামত তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা। যার অন্তরে শুকর আছে, সে কখনো হতাশ হয় না। সে ‘কী পাইনি’ তা নিয়ে আফসোস না করে, ‘কী পেয়েছি’ তা নিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। এই কৃতজ্ঞতাবোধই তাকে অন্যের সাথে তুলনা করার অসুস্থ মানসিকতা থেকে রক্ষা করে।
কোরআনের আলোকে শুকর:
আল্লাহ তা’আলা কোরআনে শুকরের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন। তিনি কৃতজ্ঞ বান্দাকে আরও বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
“আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেবো। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।'” (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)
এই আয়াতটি একটি মহা সূত্র। যা আছে তার জন্য শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা আরও বাড়িয়ে দেন। আর অকৃতজ্ঞতা নিয়ামতকে কেড়ে নেয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অসংখ্য নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
“আর যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।” (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৪)
হাদিসের আলোকে শুকর:
রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। ঘুম থেকে উঠে, খাওয়ার পরে, নতুন পোশাক পরে—সর্বাবস্থায় তিনি আল্লাহর প্রশংসা করতেন। তিনি রাতের পর রাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন, এমনকি তাঁর পা ফুলে যেত। আয়েশা (রা.) যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন, তবুও আপনি এত কষ্ট করেন কেন?” তিনি উত্তর দিলেন:
“আমি কি একজন কৃতজ্ঞ (শাকূর) বান্দা হবো না?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৩৭)
রাসূল (সা.) আরও শিক্ষা দিয়েছেন যে, শুধু আল্লাহরই নয়, মানুষেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। তিনি বলেন:
“যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮১১)
এই হাদিসটি শিশুদের সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ তাকে কোনো উপহার দিলে বা তার কোনো উপকার করলে তাকে ধন্যবাদ (‘জাযাকাল্লাহু খাইরান’) বলতে শেখানো উচিত।
সন্তানের অন্তরে শুকর রোপণের উপায়:
১. নিয়মিত নিয়ামত স্মরণ করানো: প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সবাই একসাথে বসে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন—আমরা আজ সুস্থ আছি, খাবার পেয়েছি, সুন্দর একটি বাড়ি পেয়েছি ইত্যাদি। এরপর সবাই মিলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা।
২. ‘শুকর জার্নাল’ তৈরি: সন্তানকে একটি নোটবুক দেওয়া যেতে পারে যেখানে সে প্রতিদিন আল্লাহর দেওয়া অন্তত তিনটি নিয়ামতের কথা লিখবে। এই অভ্যাস তার মধ্যে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে।
৩. অভাবীদের অবস্থা দেখানো: মাঝে মাঝে এতিমখানা, হাসপাতাল বা বস্তি এলাকায় সন্তানকে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে সে নিজের অবস্থা এবং অন্যদের অবস্থার পার্থক্য বুঝতে পারে। এতে সে নিজের প্রাপ্তিগুলোর জন্য আল্লাহর প্রতি আরও বেশি কৃতজ্ঞ হবে।
৪. দোয়ার শিক্ষা: সন্তানদেরকে শেখাতে হবে যে, প্রতিটি ভালো জিনিস পাওয়ার পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হয় এবং যেকোনো প্রয়োজনের জন্য একমাত্র তাঁর কাছেই চাইতে হয়। এই বিশ্বাস তাকে আত্মনির্ভরশীল ও আল্লাহর প্রতি অনুগত করে তুলবে।
উপসংহার
আধুনিক সমাজের অসুস্থ প্রতিযোগিতা নামক সয়লাব থেকে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করা এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইসলামের দেওয়া প্রেসক্রিপশন—কানা’আত, দানশীলতা এবং শুকর—এক অব্যর্থ মহৌষধ। এই তিনটি গুণ নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যার অল্পে তুষ্টি আছে, সে-ই সহজে দান করতে পারে। আর যে দান করে এবং অল্পে তুষ্ট থাকে, তার অন্তর আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ থাকে।
এই গুণাবলি কোনো পুঁথিগত বিদ্যা নয় যে শিশুকে জোর করে শেখানো যাবে। বরং এটি একটি জীবনদর্শন, যা পিতামাতাকে প্রথমে নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে। সন্তানের সামনে যখন একটি জীবন্ত আদর্শ থাকবে, তখন সে প্রকৃত ভাবেই এই মহৎ গুণগুলো আয়ত্ত করতে পারবে। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের অন্তরে এই তিনটি গুণের বীজ বপন করতে পারি, তবে তারা কেবল দুনিয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকেই রক্ষা পাবে না, বরং তারা হয়ে উঠবে একজন প্রশান্ত, সুখী, সফল এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত মানুষ, যারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সফলকাম হবে। আর একজন মুসলিম পিতা-মাতার জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না।