পবিত্র কুরআন কেবল একটি ইবাদতের গ্রন্থ নয়, এটি মানব ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল এবং ভবিষ্যতের জন্য এক সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই গ্রন্থে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের যে বিবরণ দিয়েছেন, তার মধ্যে বনী ইসরাঈলের (ইহুদি জাতি) আলোচনা সবচেয়ে বিস্তৃত, বিস্তারিত এবং শিক্ষণীয়। অন্য কোনো জাতির উত্থান-পতন, আল্লাহর প্রতি তাদের আনুগত্য ও অবাধ্যতা, এবং তার বিপরীতে আল্লাহর প্রতিদান ও শাস্তির বিবরণ এত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কুরআনে আসেনি।
এর কারণ হলো, বনী ইসরাঈলের এই ইতিহাস মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি আয়না (Mirror) স্বরূপ। তাদের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে আমরা একটি জাতির উত্থান-পতনের ঐশী মূলনীতিগুলো (Divine Laws) বুঝতে পারি।
তবে, বিষয়টি কেবল ইতিহাসের শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহীহ হাদিস বনী ইসরাঈল সম্পর্কে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, যা সরাসরি শেষ জামানা বা কিয়ামতের আলামতের সাথে সম্পর্কিত। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর সেই দলীলগুলো একত্রিত করে একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা—কীভাবে তাদের অতীত, বর্তমানের প্রত্যাবর্তন এবং ভবিষ্যত এক সূত্রে গাঁথা।
আমরা দেখব যে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বর্তমান ইসরাঈল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি হাজার বছর পূর্বে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক ঘোষিত এক ভবিষ্যদ্বাণীর বিস্ময়কর বাস্তবায়ন, যা আমাদেরকে শেষ জামানার চূড়ান্ত অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
প্রথম অধ্যায়: ঐশী ফয়সালা এবং দুটি মহান বিপর্যয় (القضاء الإلهي والإفساد مرتين)
বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের সারসংক্ষেপ এবং তাদের ভবিষ্যত গতিপথ আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-ইসরা-তে (যা সূরা বনী ইসরাঈল নামেও পরিচিত) চারটি আয়াতে (৪-৭) একটি অমোঘ 1 বিধান বা ফয়সালা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দলীল ১: সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৪
وَقَضَيْنَا إِلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ فِي الْكِتَابِ لَتُفْسِدُنَّ فِي الْأَرْضِ مَرَّتَيْنِ وَلَتَعْلُنَّ عُلُوًّا كَبِيرًا
অনুবাদ: “এবং আমি কিতাবে (তাওরাতে) বনী ইসরাঈলকে চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, তোমরা পৃথিবীতে দু’বার বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি করবে এবং তোমরা অতিশয় অহংকার (চরম ঔদ্ধত্য) প্রদর্শন করবে।” (১৭:৪)
বিশ্লেষণ:
وَقَضَيْنَا(আমরা চূড়ান্ত ফয়সালা দিলাম): এটি কোনো সাধারণ কথা নয়, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অমোঘ বিধান।لَتُفْسِدُنَّ(তোমরা অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টি করবে): আরবি ব্যাকরণে এটি সর্বোচ্চ তাগিদ (Emphasis) বোঝায়। আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞানে জানতেন যে, তারা এই কাজটি করবেই।مَرَّتَيْنِ(দু’বার): এই বিপর্যয় হবে দুটি প্রধান পর্বে।وَلَتَعْلُنَّ عُلُوًّا كَبِيرًا(এবং তোমরা অতিশয় অহংকার করবে): তাদের এই বিপর্যয়ের মূল চালিকাশক্তি হবে তাদের জাতিগত অহংকার, দম্ভ এবং সীমালঙ্ঘন।
ইসলামী ইতিহাস ও তাফসীর অনুযায়ী, এই দুটি বিপর্যয় ঐতিহাসিকভাবে ঘটে গেছে।
১. প্রথম বিপর্যয় ও তার শাস্তি (First Corruption):
তারা আল্লাহর কিতাব তাওরাতকে বিকৃত করে, নবীদের (আঃ) একটি দলকে হত্যা করে (যেমন হযরত জাকারিয়া ও ইয়াহইয়া আঃ), সমাজে অন্যায়-অবিচার ও সুদকে বৈধ করে। যখন তাদের এই فَسَاد (বিপর্যয়) এবং عُلُوّ (ঔদ্ধত্য) চরমে পৌঁছায়, তখন আল্লাহর শাস্তি নেমে আসে।
দলীল ২: সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৫
فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ أُولَاهُمَا بَعَثْنَا عَلَيْكُمْ عِبَادًا لَّنَا أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ فَجَاسُوا خِلَالَ الدِّيَارِ ۚ وَكَانَ وَعْدًا مَّفْعُولًا
অনুবাদ: “অতঃপর যখন সেই দু’টির প্রথমটির নির্ধারিত সময় আসলো, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার কিছু বান্দাকে, যারা ছিল অত্যন্ত কঠোর যোদ্ধা। অতঃপর তারা তোমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে (অনুপ্রবেশ করে) সব তছনছ করে দিয়েছিল। আর এটা ছিল এমন এক প্রতিশ্রুতি যা বাস্তবায়িত হওয়ারই ছিল।” (১৭:৫)
ঐতিহাসিক প্রতিফলন: অধিকাংশ মুফাসসির একমত যে, এটি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ব্যাবিলনের রাজা বখতনাসর (Nebuchadnezzar)-এর জেরুজালেম আক্রমণ। সে তাদের ইবাদতখানা ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ (First Temple) ধ্বংস করে দেয়, লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করে এবং বাকিদের বন্দী হিসেবে ব্যাবিলনে নির্বাসিত করে। এটি ছিল তাদের প্রথম বড় পতন।
২. দ্বিতীয় বিপর্যয় ও তার শাস্তি (Second Corruption):
আল্লাহ তাদের পুনরায় সুযোগ দেন। তারা ব্যাবিলন থেকে ফিরে আসে, আবার বাইতুল মুকাদ্দাস (Second Temple) নির্মাণ করে এবং সমৃদ্ধি লাভ করে। কিন্তু তারা তাদের অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি।
দলীল ৩: সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৭ (প্রথম অংশ)
…فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ لِيَسُوءُوا وُجُوهَكُمْ وَلِيَدْخُلُوا الْمَسْجِدَ كَمَا دَخَلُوهُ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَلِيُتَبِّرُوا مَا عَلَوْا تَتْبِيرًا
অনুবাদ: “…অতঃপর যখন দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতির সময় আসলো (তখন আমি অন্যদের পাঠালাম), যাতে তারা তোমাদের চেহারা বিকৃত করে দেয়, আর তারা যেন (বাইতুল মুকাদ্দাস) মসজিদে প্রবেশ করে, যেমনটি প্রথমবার প্রবেশ করেছিল এবং যা কিছু তাদের কর্তৃত্বে আসে তা যেন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।” (১৭:৭)
ঐতিহাসিক প্রতিফলন: তাদের দ্বিতীয় বিপর্যয়ের চূড়ান্ত রূপ ছিল আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী হযরত ঈসা (আঃ)-কে প্রত্যাখ্যান করা, তাঁর বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ দেওয়া এবং তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা (যদিও আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেন)। এই সীমালঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সেনাপতি টাইটাস (Titus) জেরুজালেম আক্রমণ করে। রোমানরা তাদের দ্বিতীয় বাইতুল মুকাদ্দাস সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়, লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করে এবং বাকিদের পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিতাড়িত করে দেয়। এটিই সেই ঐতিহাসিক ‘ডায়াসপোরা’ (Diaspora) বা বিশ্বব্যাপী নির্বাসন, যা পরবর্তী প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বলবৎ ছিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: বিক্ষিপ্তকরণ এবং শেষ জামানায় একত্রিতকরণের ভবিষ্যদ্বাণী
রোমানদের হাতে বিতাড়িত হওয়ার পর বনী ইসরাঈল একটি যাযাবর ও বিক্ষিপ্ত জাতিতে পরিণত হয়। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটিও ছিল আল্লাহর একটি পরিকল্পিত শাস্তি, যা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলীল ৪: সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ১৬৮
وَقَطَّعْنَاهُمْ فِي الْأَرْضِ أُمَمًا…
অনুবাদ: “এবং আমি তাদেরকে পৃথিবীতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে (ছড়িয়ে) দিয়েছি…” (৭:১৬৮)
এই আয়াতটি তাদের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের (Diaspora) সুস্পষ্ট দলীল। প্রায় ১৯০০ বছর ধরে তারা ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও আরবের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে أُمَمًا (বিভিন্ন দল ও জাতি) হিসেবে বসবাস করছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নির্বাসনের শেষ কোথায়? এখানেই কুরআনের সবচেয়ে বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণীটি আসে, যা সরাসরি বর্তমান ইসরাঈল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-ইসরা-তেই এই বিক্ষিপ্ত জাতিকে শেষ জামানায় পুনরায় একত্রিত করার কথা বলেছেন।
দলীল ৫: সূরা আল-ইসরা, আয়াত ১০৪
وَقُلْنَا مِن بَعْدِهِ لِبَنِي إِسْرَائِيلَ اسْكُنُوا الْأَرْضَ فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيفًا
অনুবাদ: “এবং এরপর আমি বনী ইসরাঈলকে বললাম, ‘তোমরা পৃথিবীতে (ছড়িয়ে পড়ে) বসবাস করতে থাক। অতঃপর যখন শেষ জামানার প্রতিশ্রুতি (وَعْدُ الْآخِرَةِ) এসে পড়বে, তখন আমি তোমাদের সকলকে একত্রিত (لَفِيفًا) করে উপস্থিত করব’।” (১৭:১০৪)
বিশ্লেষণ (সংযোগ স্থাপন):
এই আয়াতটিই হলো বর্তমান পরিস্থিতির চাবিকাঠি।
১. اسْكُنُوا الْأَرْضَ (তোমরা পৃথিবীতে বসবাস কর): এটি সেই বিক্ষিপ্ত (Diaspora) জীবনের নির্দেশ।
২. فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ (অতঃপর যখন শেষ জামানার প্রতিশ্রুতি এসে পড়বে): আল্লাহ এখানে একটি সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কখন তারা একত্রিত হবে? যখন ‘আখিরাতের ওয়াদা’ বা ‘শেষ জামানা’ এসে পড়বে।
৩. جِئْنَا بِكُمْ لَفِيفًا (আমি তোমাদের সকলকে একত্রিত করে উপস্থিত করব): এটিই সেই ভবিষ্যদ্বাণী। لَفِيفًا (লাফীফা) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো “একটি মিশ্র জনতা”, “বিভিন্ন স্থান থেকে জড়ো করা একটি জটলা”, “নানা বর্ণের, নানা গোত্রের, নানা ভাষার মানুষের সমাবেশ”।
সংযোগ: ১৯৪৮ সালে যখন ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কী ঘটেছিল? পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে—রাশিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড (ইউরোপ), ইথিওপিয়া (আফ্রিকা), ইয়েমেন, ইরাক (আরব) এবং আমেরিকা থেকে—বিভিন্ন বর্ণের, বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন সংস্কৃতির ইহুদিরা এসে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জড়ো হতে শুরু করে। তারা ঠিক لَفِيفًا বা “একটি মিশ্র জনতা” হিসেবেই একত্রিত হয়েছে।
সুতরাং, কুরআন অনুযায়ী, বনী ইসরাঈলের এই প্রত্যাবর্তন ও রাষ্ট্র গঠন কোনো মানুষের পরিকল্পনা বা রাজনৈতিক বিজয় নয়, বরং এটি স্বয়ং আল্লাহর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, যা وَعْدُ الْآخِرَةِ (শেষ জামানার) আগমনকে অবহিত করে।
তৃতীয় অধ্যায়: প্রত্যাবর্তনের পর তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও যুদ্ধের কৌশল
কুরআন কেবল তাদের একত্রিত হওয়ার কথাই বলেনি, বরং তাদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, যা বর্তমান সময়ের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
দলীল ৬: পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির প্রবণতা
…كُلَّمَا أَوْقَدُوا نَارًا لِّلْحَرْبِ أَطْفَأَهَا اللَّهُ ۚ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا ۚ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
অনুবাদ: “…যখনই তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন। আর তারা পৃথিবীতে ফাসাদ (বিপর্যয় ও অশান্তি) সৃষ্টি করার জন্য ঘুরে বেড়ায়। আর আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৬৪)
সংযোগ: এই আয়াতটি তাদের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে। كُلَّمَا (যখনই) শব্দটি প্রমাণ করে যে, এটি তাদের অভ্যাস। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনি মুসলিমদের উপর তাদের জুলুম ও অত্যাচারকে ইসলামী চিন্তাবিদগণ এই وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا (পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির প্রচেষ্টা) এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
দলীল ৭: তাদের যুদ্ধের কৌশল ও অভ্যন্তরীণ বিভেদ
আল্লাহ তা’আলা মদীনার ইহুদি গোত্র বনু নাদিরের দুর্বলতা বর্ণনা করতে গিয়ে এমন একটি কথা বলেছেন, যা যেন বর্তমান ইসরাঈলের সামরিক কৌশলের নিখুঁত চিত্রায়ন।
لَا يُقَاتِلُونَكُمْ جَمِيعًا إِلَّا فِي قُرًى مُّحَصَّنَةٍ أَوْ مِن وَرَاءِ جُدُرٍ ۚ بَأْسُهُم بَيْنَهُمْ شَدِيدٌ ۚ تَحْسَبُهُمْ جَمِيعًا وَقُلُوبُهُم شَتًّى…
অনুবাদ: “তারা সবাই متحد (ইউনাইটেড) হয়েও তোমাদের বিরুদ্ধে (খোলা ময়দানে) যুদ্ধ করতে পারবে না, তবে সুরক্ষিত জনপদের ভেতরে অথবা দেয়ালের আড়াল থেকে (যুদ্ধ করবে)। তাদের পারস্পরিক কোন্দল অত্যন্ত شدید (তীব্র)। তুমি মনে কর তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের অন্তরসমূহ বিভক্ত (ও বিচ্ছিন্ন)…।” (সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৪)
বিশ্লেষণ (সংযোগ স্থাপন):
إِلَّا فِي قُرًى مُّحَصَّnَةٍ(সুরক্ষিত জনপদের ভেতরে): এটি বর্তমান ইসরায়েলি ‘Settlements’ বা সুরক্ষিত ইহুদি বসতি এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিখুঁত বর্ণনা।أَوْ مِن وَرَاءِ جُدُرٍ(অথবা দেয়ালের আড়াল থেকে): এটি আরও বিস্ময়কর। বর্তমান ইসরাঈল ফিলিস্তিনিদের থেকে পৃথক হওয়ার জন্য শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ ‘Separation Wall’ (বিভেদ প্রাচীর) নির্মাণ করেছে। গাজাকে চারদিক থেকে দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছে। তাদের ‘আয়রন ডোম’ (Iron Dome) নামক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাওمِن وَرَاءِ جُدُرٍ(দেয়ালের আড়াল থেকে সুরক্ষা) এর আধুনিক রূপ। তারা সরাসরি সম্মুখযুদ্ধের চেয়ে প্রযুক্তি এবং দেয়ালের আড়ালে থেকে যুদ্ধ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।تَحْسَبُهُمْ جَمِيعًا وَقُلُوبُهُم شَتًّى(তুমি মনে কর তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের অন্তরসমূহ বিভক্ত): বাইরে থেকে ইসরাঈলকে অত্যন্ত ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও, তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত। তাদের মধ্যে সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) ইহুদি, কট্টরপন্থী (Haredi) ইহুদি, রাশিয়ান ইহুদি, আমেরিকান ইহুদিদের মধ্যে বিভেদ ও কোন্দল (بَأْسُهُم بَيْنَهُمْ شَدِيدٌ) সর্বজনবিদিত।
চতুর্থ অধ্যায়: চূড়ান্ত অধ্যায় এবং সহীহ হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী
কুরআন আমাদের জানালো যে, বনী ইসরাঈল শেষ জামানায় একত্রিত হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন? তাদের এই একত্রিত হওয়ার উদ্দেশ্য কী?
এর উত্তর আমরা সূরা আল-ইসরা-এর সেই অমোঘ নীতিতে পাই:
দলীল ৮: ঐশী নীতি—প্রত্যাবর্তন করলে শাস্তিও প্রত্যাবর্তন করবে
…وَإِنْ عُدتُّمْ عُدْنَا ۘ وَجَعَلْنَا جَهَنَّمَ لِلْكَافِرِينَ حَصِيرًا
অনুবাদ: “…এবং তোমরা যদি পুনরায় (বিপর্যয়ের) দিকে প্রত্যাবর্তন কর, তবে আমিও পুনরায় (শাস্তির) দিকে প্রত্যাবর্তন করব। আর আমি জাহান্নামকে কাফিরদের জন্য কারাগার বানিয়ে রেখেছি।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮)
বনী ইসরাঈলের প্রথম দুটি বিপর্যয়ের (Corruption) পর আল্লাহ তাদের শাস্তি দিয়েছেন। এখন, শেষ জামানায় لَفِيفًا (একত্রিত) হয়ে তারা যদি তৃতীয়বার সেই একই فَسَاد (বিপর্যয়) এবং عُلُوّ كَبِير (চরম ঔদ্ধত্য)—যা বর্তমানে ফিলিস্তিনে মুসলিমদের উপর জুলুমের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে—এর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তবে আল্লাহর নীতি وَإِنْ عُدتُّمْ عُدْنَا (তোমরা প্রত্যাবর্তন করলে, আমিও প্রত্যাবর্তন করব) অনুযায়ী তাদের উপর আল্লাহর চূড়ান্ত শাস্তি নেমে আসা অনিবার্য।
এই চূড়ান্ত শাস্তির বিবরণই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিসে কিয়ামতের আলামত হিসেবে এসেছে। বনী ইসরাঈলের এই একত্রিত হওয়া মূলত শেষ জামানার সেই চূড়ান্ত যুদ্ধের মঞ্চ প্রস্তুত করার জন্যই।
দলীল ৯: হাদিস – মাসীহ আদ-দাজ্জাল এবং ইহুদিদের সম্পর্ক
শেষ জামানার সবচেয়ে বড় ফিতনা হবে দাজ্জালের। রাসূল (ﷺ) স্পষ্টভাবে বলেছেন, দাজ্জালের প্রধান অনুসারী হবে ইহুদিরা।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “ইসফাহানের (বর্তমান ইরানের একটি শহর) সত্তর হাজার ইহুদি ‘তায়ালিসা’ (এক প্রকার চাদর) পরিহিত অবস্থায় দাজ্জালের অনুসরণ করবে।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৪৪
সংযোগ: দাজ্জাল হলো ইহুদিদের কাঙ্ক্ষিত ‘মাসীহ’ (Messiah) বা ‘ত্রাণকর্তা রাজা’। তাদের এই একত্রিত হওয়া এবং শক্তি সঞ্চয় করা মূলত সেই ভণ্ড মাসীহকে বরণ করার প্রস্তুতি।
দলীল ১০: হাদিস – হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রত্যাবর্তন এবং চূড়ান্ত ফয়সালা
বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটবে সেই নবীর হাতে, যাঁকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল—হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই তোমাদের মাঝে মারইয়ামের পুত্র (ঈসা) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিজিয়া কর রহিত করবেন…।”
সূত্র: সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২২২২; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৫
সংযোগ: হযরত ঈসা (আঃ) ফিরে এসে দাজ্জালকে হত্যা করবেন। যে দাজ্জাল হবে ইহুদিদের নেতা। এটিই হবে তাদের চূড়ান্ত পরাজয়।
দলীল ১১: হাদিস – মুসলিম ও ইহুদিদের চূড়ান্ত যুদ্ধ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই চূড়ান্ত যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা সংঘটিত হওয়ার জন্য ইহুদিদের এক জায়গায় (ফিলিস্তিনে) একত্রিত থাকা আবশ্যক।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না মুসলমানরা ইহুদিদের সাথে যুদ্ধ করবে। অতঃপর মুসলমানরা তাদেরকে হত্যা করবে। এমনকি ইহুদি যখন কোনো পাথর বা গাছের আড়ালে লুকাবে, তখন সেই পাথর বা গাছ বলবে: ‘হে মুসলিম! হে আল্লাহর বান্দা! এই তো আমার পিছনে ইহুদি, এসো এবং তাকে হত্যা কর।’ তবে ‘গারকাদ’ গাছ ব্যতীত, কেননা তা ইহুদিদের গাছ।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯২২; সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ২৯২৬
বিশ্লেষণ (চূড়ান্ত সংযোগ):
এই হাদিসটি বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইহুদিদের ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে এমনভাবে একত্রিত হওয়া, যেন মুসলিমদের সাথে তাদের একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ হতে পারে। যদি তারা সূরা আল-আ’রাফ (৭:১৬৮) অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী أُمَمًا (বিক্ষিপ্ত) থাকতো, তবে এই হাদিসের বাস্তবায়ন অসম্ভব ছিল।
কিন্তু আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-ইসরা (১৭:১০৪) অনুযায়ী وَعْدُ الْآخِرَةِ (শেষ জামানায়) তাদেরকে لَفِيفًا (একত্রিত) করেছেন, যেন রাসূল (ﷺ)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী এবং আল্লাহর وَإِنْ عُدتُّمْ عُدْنَا (তোমরা ফিরলে, আমিও ফিরব) নীতিটি বাস্তবায়িত হতে পারে।
উপসংহার (الخاتمة)
কুরআন ও সহীহ হাদিসের দলীলগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি স্পষ্ট ও অবিচ্ছিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে:
১. অতীত: বনী ইসরাঈল আল্লাহর কিতাব পেয়েও দু’বার বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং চরম ঔদ্ধত্য দেখায়।
২. শাস্তি ও বিক্ষিপ্তকরণ: আল্লাহ তাদের দু’বার শাস্তি দেন এবং সবশেষে তাদেরকে বিশ্বব্যাপী (Diaspora) বিক্ষিপ্ত করে দেন (আল-আ’রাফ ৭:১৬৮)।
৩. শেষ জামানার নিদর্শন: আল্লাহ ওয়াদা করেন যে, ‘শেষ জামানা’ বা কিয়ামতের পূর্বে তিনি তাদেরকে আবার একত্রিত করবেন (আল-ইসরা ১৭:১০৪), যা হবে لَفِيفًا বা একটি মিশ্র জনতা হিসেবে।
৪. বর্তমান: বিংশ শতাব্দীতে ইসরাঈল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে জড়ো হওয়া হলো সেই لَفِيفًا এর বাস্তব রূপ।
৫. বর্তমান বিপর্যয়: তারা একত্রিত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে فَسَاد (বিপর্যয়) ও عُلُوّ (ঔদ্ধত্য) প্রদর্শন করছে (আল-মায়িদাহ ৫:৬৪)।
৬. যুদ্ধের কৌশল: তাদের যুদ্ধের কৌশল (দেয়ালের আড়াল, সুরক্ষিত বসতি) এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদ (অন্তরসমূহ বিভক্ত) কুরআনের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায় (আল-হাশর ৫৯:১৪)।
৭. ভবিষ্যৎ: তাদের এই প্রত্যাবর্তন আল্লাহর وَإِنْ عُدتُّمْ عُدْنَا (তোমরা ফিরলে, আমিও ফিরব) নীতিকে সক্রিয় করেছে। এটি শেষ জামানার চূড়ান্ত যুদ্ধের (সহীহ মুসলিম ২৯২২) মঞ্চ প্রস্তুত করছে, যা দাজ্জালের ফিতনা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে।
সুতরাং, ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে যা ঘটছে, তা কেবল এক টুকরো ভূমির রাজনৈতিক সংঘাত নয়; এটি কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীর জীবন্ত বাস্তবায়ন এবং শেষ জামানার এক সুস্পষ্ট নিদর্শন। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একাধারে একটি কঠিন পরীক্ষা এবং একটি সুসংবাদ যে, ইতিহাসের চূড়ান্ত ফয়সালা অতি সন্নিকটে।
- ‘অমোঘ’ শব্দের অর্থ হলো যা কখনো ব্যর্থ হয় না, অব্যর্থ, অপরিবর্তনীয় বা সার্থক। ↩︎