أَعُوْذُ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطٰانِ الرَّجِيْمِ
অর্থ: আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
অর্থ: শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَ1شْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ۔
অর্থঃ সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই নিকট সাহায্য চাই, এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা নিজেদের নফসের অনিষ্টতা ও আমাদের খারাপ কাজের অকল্যাণ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ হিদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই; এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।
সম্মানিত ভাই ও বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আজ আমরা পবিত্র কুরআনের এমন একটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করব, যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক গভীর দলিল। এটি এমন এক আয়াত, যা প্রতিটি হতাশ হৃদয়ে আশা জাগায়, প্রতিটি বিপদগ্রস্ত মানুষকে শক্তির যোগান দেয় এবং প্রতিটি একাকী আত্মাকে বলে দেয় যে, সে একা নয়। এটি সূরা আল-বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াত।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
“আর আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (তখন বলে দিন) আমি তো قريب (অতি নিকটে)। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দিই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হয়।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৮৬)
এই আয়াতটি কোনো সাধারণ আয়াত নয়। এটি যেন বান্দার জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পাঠানো একটি ব্যক্তিগত চিঠি। এই আয়াতে কোনো মাধ্যম নেই, কোনো পর্দা নেই। আল্লাহ্ সরাসরি তাঁর বান্দার সাথে কথা বলছেন। চলুন, আমরা এই আয়াতের প্রতিটি অংশকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট (শান-ই-নুযূল)
এই আয়াতের অর্থ বোঝার আগে এর প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। তাফসীরের কিতাবগুলোতে এসেছে, একজন সাহাবী বা একদল বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের রব কি কাছে, তাহলে আমরা তাঁর সাথে চুপিচুপি কথা বলব? নাকি তিনি দূরে, তাহলে আমরা তাঁকে উচ্চস্বরে ডাকব?”
এই সহজ, সরল এবং আন্তরিক প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করেন। তিনি তাঁর নবীকে (ﷺ) উত্তর দিতে বলেননি, বরং নিজেই সরাসরি উত্তর দিচ্ছেন। এই আয়াতের গঠনশৈলী অত্যন্ত চমৎকার। আল্লাহ্ বলতে পারতেন, “হে নবী, আপনি তাদের বলে দিন যে আমি নিকটে।” কিন্তু তিনি তা বলেননি। তিনি ‘কুল’ (বলুন) শব্দটি উহ্য রেখে সরাসরি উত্তর দিয়েছেন— “فَإِنِّي قَرِيبٌ” (আমি তো অতি নিকটে)। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর ও তাঁর বান্দার মধ্যকার দূরত্বকে একেবারে মুছে দিয়েছেন।
প্রথম অংশ: “وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي” (আর আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে)
আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ্র ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশ পেয়েছে। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ্ এখানে “মানুষ” (الناس) বা “মুমিন” (المؤمنون) শব্দ ব্যবহার করেননি। তিনি বলেছেন “عِبَادِي” (আমার বান্দা)। এই “আমার” শব্দটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং স্নেহময়। যেমন একজন বাবা যখন বলেন, “আমার সন্তান”, তখন তার মধ্যে যে মমতা জড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি আল্লাহ্ যখন বলেন “আমার বান্দা”, তখন তাঁর অসীম রহমত ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
আমরা গুনাহগার, আমরা ভুল করি, কিন্তু এরপরও আল্লাহ্ আমাদেরকে “আমার” বলে সম্বোধন করছেন। এটি আমাদের জন্য কত বড় সম্মান! তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তুমি যত ভুলই করো না কেন, যত দুর্বলই হও না কেন, তুমি আমারই বান্দা। তোমার ফেরার জায়গা আমার কাছেই।
তারা প্রশ্ন করছে কাকে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে। কার সম্পর্কে? আল্লাহ্ সম্পর্কে। এই প্রশ্নটিই ঈমানের পরিচায়ক। একজন মানুষ তখনই তার স্রষ্টা সম্পর্কে জানতে চায়, যখন তার হৃদয়ে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা জন্মায়।
দ্বিতীয় অংশ: “فَإِنِّي قَرِيبٌ” (আমি তো অতি নিকটে)
এটি হলো সেই ঐশ্বরিক উত্তর, যা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে শান্ত করেছে। আল্লাহ্ বলছেন, “আমি নিকটে”। এই নৈকট্য কেমন? এটি শারীরিক নৈকট্য নয়। কারণ আল্লাহ্ তাঁর আরশে সমুন্নত, কিন্তু তিনি তাঁর জ্ঞান, তাঁর শ্রবণ, তাঁর দৃষ্টি, তাঁর ক্ষমতা এবং তাঁর সাহায্যের মাধ্যমে আমাদের অত্যন্ত নিকটে।
১. জ্ঞানের নৈকট্য:
আপনি দিনে কী করছেন, রাতে কী করছেন, আপনার মনের গভীরে কোন চিন্তা লুকিয়ে আছে, যা আপনি কাউকে বলতে পারেননি—সবই তিনি জানেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۖ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
“আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মন তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা-ও আমি জানি। আর আমি তার শাহরগের (গর্দানের রগের) চেয়েও তার বেশি নিকটে।” (সূরা ক্বাফ, ৫০:১৬)
শাহরগ হলো আমাদের গলার সেই রগ, যা আমাদের জীবনের স্পন্দন বহন করে। আল্লাহ্ বলছেন, তিনি আমাদের তার থেকেও কাছে। এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কী হতে পারে?
২. সাহায্যের নৈকট্য:
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আল্লাহ্ আপনার সাথে আছেন। আপনি গভীর সমুদ্রে থাকুন, মরুভূমিতে থাকুন বা অন্ধকার ঘরে একা বসে থাকুন, তিনি আপনাকে দেখছেন এবং আপনার অবস্থা জানেন।
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।” (সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:৪)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন হিজরতের সময় হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে নিয়ে সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন শত্রুরা গুহার মুখে এসে পড়েছিল। আবু বকর (রাঃ) ভীত হয়ে পড়লে রাসূল (ﷺ) তাঁকে বলেছিলেন:
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
“চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৪০)
এই “সাথে থাকা” বা “নিকটে থাকা” হলো মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
৩. শ্রবণের নৈকট্য:
আপনাকে চিৎকার করে ডাকার প্রয়োজন নেই। আপনার হৃদয়ের চাপা কান্না, আপনার অনুচ্চারিত আর্তনাদও তিনি শোনেন।
একবার সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এক সফরে উচ্চস্বরে যিকির করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন:
“হে লোকসকল! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। কেননা তোমরা কোনো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না, বরং তোমরা ডাকছ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ও নিকটবর্তী সত্তাকে। তোমরা যাঁকে ডাকছ, তিনি তোমাদের বাহনের গর্দানের চেয়েও বেশি নিকটে।” (সহীহ বুখারী)
এই হাদীসটি আলোচ্য আয়াতের এক চমৎকার ব্যাখ্যা।
তৃতীয় অংশ: “أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ” (আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দিই)
এটি এই আয়াতের কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ্ এখানে কোনো শর্ত দেননি। তিনি বলেননি, “আমি শুধু নেককার বান্দার দু’আ কবুল করি” বা “আমি শুধু মসজিদে বসে করা দু’আ কবুল করি”। তিনি বলেছেন, “যে কেউ” (الدَّاعِ), “যখনই” (إِذَا) আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।
একজন পাপী, একজন অপরাধী, চরম হতাশাগ্রস্ত একজন মানুষও যখন আন্তরিকভাবে “ইয়া আল্লাহ্” বলে ডাকে, আল্লাহ্ তার ডাকে সাড়া দেন। হযরত ইউনুস (আঃ)-এর কথা চিন্তা করুন। তিনি মাছের পেটে, সাগরের তলদেশের গভীর অন্ধকারে বসে আল্লাহকে ডেকেছিলেন:
لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
“আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, আপনি কতই না পবিত্র! নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৭)
সেখানে না ছিল জায়নামাজ, না ছিল ওযু, না ছিল ক্বিবলামুখী হওয়ার সুযোগ। কিন্তু ছিল আন্তরিকতা ও অসহায়ত্ব। আর আল্লাহ্ সেই গভীর অন্ধকার থেকে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।
পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ্ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন:
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ
“তিনিই তো, যিনি অসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে এবং তার কষ্ট দূর করেন।” (সূরা আন-নামল, ২৭:৬২)
দু’আ কবুলের ধরণ:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের শিখিয়েছেন যে, আল্লাহ্র “সাড়া দেওয়া” তিনভাবে হতে পারে:
১. বান্দা যা চেয়েছে, আল্লাহ্ তাকে ঠিক তাই দান করেন।
২. বান্দা যা চেয়েছে, তার পরিবর্তে আল্লাহ্ তার উপর থেকে সমপরিমাণ কোনো বিপদ বা কষ্ট দূর করে দেন, যা হয়তো তার জন্য বেশি কল্যাণকর ছিল।
৩. অথবা, আল্লাহ্ তার সেই দু’আকে আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন এবং কিয়ামতের দিন তাকে এর বিনিময়ে অনেক প্রতিদান দেবেন, যা দেখে বান্দা আফসোস করে বলবে, “হায়! যদি দুনিয়াতে আমার কোনো দু’আই কবুল না হতো!”
(মুসনাদে আহমাদ)
সুতরাং, মুমিনের কোনো দু’আই বৃথা যায় না। প্রতিটি “ইয়া আল্লাহ্” ধ্বনি আল্লাহ্র কাছে পৌঁছায় এবং তার প্রতিদান নিশ্চিত।
চতুর্থ অংশ: “فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي” (সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক)
এখন আল্লাহ্ আমাদের দায়িত্বের কথা বলছেন। তিনি যেমন আমাদের ডাকে সাড়া দেন, তিনিও চান আমরা যেন তাঁর ডাকে সাড়া দিই। এটি একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। আল্লাহ্র ডাক কী?
- আল্লাহ্র ডাক হলো তাঁর আদেশ-নিষেধ: “আযান” হলো সালাতের জন্য আল্লাহ্র ডাক। যখন মুয়াজ্জিন বলেন, “হাইয়া আলাস সালাহ” (নামাযের জন্য এসো), তখন দুনিয়ার সব কাজ ছেড়ে মসজিদে যাওয়াই হলো আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দেওয়া। রমজান মাসে রোজা রাখা, যাকাত আদায় করা, সত্য কথা বলা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা—এই সবই আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
- আল্লাহ্র প্রতি ঈমান: শুধু মুখে ঈমানের স্বীকারোক্তি নয়, বরং অন্তরের গভীর থেকে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করা। এমন বিশ্বাস যে, আল্লাহ্ যা করেন, আমার ভালোর জন্যই করেন। আমার দু’আ তিনি শুনছেন এবং আমার জন্য যা উত্তম, তাই তিনি করবেন—এই দৃঢ় প্রত্যয়ই হলো “وَلْيُؤْمِنُوا بِي”। একে বলা হয় “ইয়াক্বীন”।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“তোমরা আল্লাহ্র কাছে এমনভাবে দু’আ করো যেন তোমাদের দু’আ কবুল হবে—এই ব্যাপারে তোমরা সুনিশ্চিত থাকো। আর জেনে রেখো, আল্লাহ্ কোনো উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দু’আ কবুল করেন না।” (তিরমিযী)
সুতরাং, দু’আ কবুলের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এই আয়াতেই বলে দেওয়া হয়েছে:
১. আল্লাহ্র আনুগত্য করা (তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়া): একজন ব্যক্তি যদি আল্লাহ্র নাফরমানিতে লিপ্ত থাকে, হারাম উপার্জন করে, তাহলে তার দু’আ কবুল হওয়া কঠিন। রাসূল (ﷺ) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে দীর্ঘ সফর করে, ধুলোমলিন শরীরে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘ইয়া রব, ইয়া রব’ বলে ডাকে, কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম। নবীজি (ﷺ) বললেন, “তার দু’আ কীভাবে কবুল হবে?” (সহীহ মুসলিম)
২. আল্লাহ্র প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখা: বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছাড়া এই বিশ্বাস রাখা যে, আমার রব আমার ডাক শুনছেন এবং তিনি সাড়া দিতে সক্ষম।
পঞ্চম অংশ: “لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ” (যাতে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হয়)
এটি হলো এই পুরো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ডাকে, তাঁর ডাকে সাড়া দেয় এবং তাঁর প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখে, তার পুরস্কার কী? আল্লাহ্ তাকে “রুশদ” (رشد) দান করবেন।
“রুশদ” শব্দটি আরবিতে অত্যন্ত ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর মানে শুধু হেদায়েত বা সঠিক পথ পাওয়া নয়। এর অর্থ হলো:
- সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোনটা সঠিক এবং কোনটা ভুল, তা বোঝার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ করা।
- বুদ্ধিমত্তা ও পরিপক্কতা: চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক পরিপক্কতা অর্জন করা।
- কল্যাণের পথে পরিচালিত হওয়া: দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণের পথে পরিচালিত হওয়া।
যখন একজন বান্দা আল্লাহ্র সাথে তার সম্পর্ককে এভাবে গড়ে তোলে, তখন তার জীবন আল্লাহ্র নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্দেশিত হয়। সে আর পথ হারায় না।
উপসংহার ও আমাদের করণীয়
ভাই ও বোনেরা, সূরা বাকারার এই একটি আয়াত আমাদের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আসুন, এই আয়াত থেকে আমাদের জীবনের জন্য কিছু শিক্ষা গ্রহণ করি:
১. কখনো হতাশ হবেন না: জীবনে যতই ঝড় আসুক, যত অন্ধকারই ঘিরে ধরুক, মনে রাখবেন— “فَإِنِّي قَرِيبٌ” (আমি নিকটে)। আপনার রব আপনার শাহরগের চেয়েও কাছে। তাঁকে ডাকুন, তাঁর সাথে কথা বলুন।
২. দু’আকে আপনার অস্ত্রে পরিণত করুন: দু’আ মুমিনের হাতিয়ার। যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো বিপদে, যেকোনো ইচ্ছায় প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো দু’আ করা। হাত তুলে আল্লাহ্র কাছে চেয়ে নিন, কারণ তিনিই একমাত্র দাতা। আল্লাহ্ বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“আর তোমাদের রব বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’।” (সূরা গাফির, ৪০:৬০)
৩. সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক করুন: আমরা যেমন চাই আল্লাহ্ আমাদের ডাকে সাড়া দিক, তেমনি আমাদেরও তাঁর ডাকে সাড়া দিতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্র আনুগত্যে নিজেকে সঁপে দিন।
৪. ইয়াক্বীন বৃদ্ধি করুন: আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান, যেখানে কোনো সন্দেহ থাকবে না। বিশ্বাস করুন, আপনার প্রতিটি দু’আ শোনা হচ্ছে এবং এর উত্তম প্রতিদান আপনি পাবেনই।
৫. মাধ্যম ত্যাগ করুন: আল্লাহকে ডাকার জন্য কোনো পীর, মাজার বা অন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই। সম্পর্কটি সরাসরি আপনার এবং আপনার রবের মধ্যে। নির্জনে, সিজদায়, চোখের পানিতে তাঁর কাছে আপনার সব কথা বলুন। তিনিই একমাত্র সত্তা, যিনি আপনার সব গোপন কথা জানেন এবং আপনার সব প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে এই আয়াতের গভীরতা অনুধাবন করার এবং তদনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। তিনি যেন আমাদের সবাইকে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হিসেবে কবুল করেন এবং আমাদের সকল নেক দু’আ কবুল করেন।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين