দারস: সূরা আত-তাকাসুর (প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা)

Sura At-Takasur (Prachuryer Protijogita)
Sura At-Takasur (Prachuryer Protijogita)

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আজ আমরা পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সূরা, ‘সূরা আত-তাকাসুর’ নিয়ে আলোচনা করব। মক্কায় অবতীর্ণ এই সূরাটি মাত্র আটটি আয়াতে মানবজীবনের এক গভীর সত্যকে তুলে ধরেছে, যা আজকের আধুনিক পৃথিবীর জন্য আগের চেয়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। এই সূরাটি আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এক ভয়াবহ মোহ থেকে সতর্ক করে, যার নাম ‘তাকাসুর’ বা প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা।

চলুন, আমরা বর্তমান পৃথিবীর দিকে একবার তাকাই। আমাদের চারপাশে কীসের প্রতিযোগিতা? আরও বেশি অর্থ, আরও বড় বাড়ি, নতুন মডেলের গাড়ি, ব্র্যান্ডের পোশাক, সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও বেশি লাইক, ফলোয়ার, খ্যাতি এবং ক্ষমতা। এই সীমাহীন চাহিদা ও প্রতিযোগিতাই হলো ‘তাকাসুর’। আর এই সূরাটি যেন ১৪০০ বছর আগে আমাদের আজকের এই অবস্থার কথাই বলে গেছে।

আলোচনা:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শুরু করছেন:

أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ (1) حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ (2)

অর্থ: “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে উপস্থিত হও।” (সূরা আত-তাকাসুর: ১-২)

ব্যাখ্যা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:

এখানে ‘আলহা’ (أَلْهَا) শব্দের অর্থ হলো এমনভাবে কোনো কিছুতে মগ্ন হয়ে যাওয়া যে, অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মনোযোগ সরে যায়। আর ‘তাকাসুর’ (التَّكَاثُرُ) এসেছে ‘কাছরাত’ থেকে, যার অর্থ প্রাচুর্য, আধিক্য। তাকাসুর মানে শুধু সম্পদ জমানো নয়, বরং সম্পদে, সম্মানে, সন্তান-সন্ততিতে, ক্ষমতায়—একে অপরের চেয়ে বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা করা।

আল্লাহ বলছেন, এই প্রতিযোগিতা আমাদের বিবেককে গ্রাস করে ফেলেছে। আমরা এতটাই মত্ত যে, জীবনের মূল উদ্দেশ্য—আল্লাহর ইবাদত এবং আখিরাতের প্রস্তুতি—ভুলে গেছি। এই প্রতিযোগিতা কখন শেষ হয়? আল্লাহ বলছেন, “যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে উপস্থিত হও।” অর্থাৎ, মৃত্যু এসে এই সমস্ত প্রতিযোগিতার অবসান ঘটায়।

আজকের দিনে এই দুটি আয়াত আমাদের জন্য এক আয়নার মতো। আমাদের জীবনের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি?

  • ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতা: পদোন্নতির জন্য, বেশি বেতনের জন্য আমরা দিনরাত এক করে ফেলি। পরিবারকে সময় দিতে পারি না, নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারি না, এমনকি আল্লাহর ইবাদতের জন্যও সময় বের করতে কষ্ট হয়।
  • সোশ্যাল মিডিয়ার ‘তাকাসুর’: কার কত ফলোয়ার, কার ছবিতে কত লাইক, কে কত সুন্দর জায়গায় ঘুরতে গেল—এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। আমরা অন্যের কাছে নিজেকে বড় করে দেখানোর জন্য এমন জীবন যাপন করি, যা হয়তো আমাদের নিজেদেরই ভালো লাগে না।
  • ভোগবাদী সংস্কৃতি (Consumerism): আমাদের প্রয়োজন না থাকলেও নতুন মডেলের ফোন, নতুন ডিজাইনের পোশাক বা নতুন গাড়ি কেনা চাই। কারণ, পাশের বাসার মানুষটি কিনেছে, বা বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে এটাই ‘সফলতা’। এই ভোগবাদই হলো আধুনিক ‘তাকাসুর’।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মানুষের এই অতৃপ্ত চাহিদার কথা একটি হাদীসে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

“যদি আদম সন্তানের জন্য স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে চাইবে যে তার জন্য দুটি উপত্যকা হোক। আর তার মুখ মাটি ছাড়া আর কিছুতেই ভরবে না।” (সহীহ বুখারী: ৬৪৩৬)

এই হাদীসটি সরাসরি প্রথম দুটি আয়াতের ব্যাখ্যা। আমাদের চাহিদা কখনও পূরণ হয় না, যতক্ষণ না মৃত্যু এসে আমাদের থামিয়ে দেয়।

এরপর আল্লাহ আমাদের কঠোরভাবে সতর্ক করছেন:

كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ (3) ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ (4)

অর্থ: “কখনোই নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। অতঃপর আবারও বলছি, কখনোই নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে।” (সূরা আত-তাকাসুর: ৩-৪)

ব্যাখ্যা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:

‘কাল্লা’ (كَلَّا) শব্দটি একটি কঠোর ধমক। আল্লাহ বলছেন, তোমরা যা করছ এবং যা ভাবছ, তা সম্পূর্ণ ভুল। এই প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা অর্থহীন। একদিন তোমরা এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবে। এই আয়াতটি দুইবার পুনরাবৃত্তি করে আল্লাহ এর গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।

কখন আমরা জানতে পারব? মুফাসসিরগণ বলেন, প্রথমবার জানার মুহূর্ত হলো মৃত্যু, যখন ফেরেশতাদের দেখা যাবে এবং পরকালের জীবন শুরু হবে। আর দ্বিতীয়বার জানা হবে কিয়ামতের মাঠে, যখন চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ শুরু হবে। তখন মানুষ বুঝবে যে, কোন জিনিসের প্রতিযোগিতা করা উচিত ছিল আর কোন জিনিস তাদের ধ্বংস করেছে। কিন্তু তখন আর ফেরার কোনো পথ থাকবে না।

আল্লাহ তা’আলা অন্য আয়াতে বলেন:

“অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, সে বলে, ‘হে আমার রব, আমাকে আবার ফেরত পাঠান, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি আগে করিনি।’ কখনোই নয়! এটি তো তার একটি কথার কথা মাত্র।” (সূরা আল-মুমিনুন: ৯৯-১০০)

এরপর আল্লাহ বলছেন, যদি আমাদের সামান্যতম উপলব্ধি থাকত, তাহলে আমাদের আচরণ কেমন হতো:

كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ (5) لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ (6) ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ (7)

অর্থ: “কখনোই নয়, যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জানতে! তোমরা অবশ্যই জাহান্নামকে দেখতে পাবে। অতঃপর তোমরা তা চাক্ষুষ প্রত্যয়ে দেখতে পাবে।” (সূরা আত-তাকাসুর: ৫-৭)

ব্যাখ্যা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:

এখানে ‘ইলমুল ইয়াকিন’ (عِلْمَ الْيَقِينِ) বা ‘নিশ্চিত জ্ঞান’ বলতে বোঝানো হয়েছে পরকালের প্রতি এমন দৃঢ় বিশ্বাস, যা আমাদের কর্মকে প্রভাবিত করে। আল্লাহ বলছেন, যদি তোমাদের সেই স্তরের বিশ্বাস থাকত, তাহলে তোমরা দুনিয়াতেই যেন জাহান্নাম দেখতে পেতে। অর্থাৎ, এর ভয়ে তোমরা ‘তাকাসুর’ থেকে দূরে থাকতে।

যেমন, আমরা যদি নিশ্চিতভাবে জানি যে রাস্তার শেষে আগুন জ্বলছে, আমরা কি সেই রাস্তায় দৌড়াব? কখনোই না। ঠিক তেমনি, যদি আমরা আখিরাতের ব্যাপারে ‘ইলমুল ইয়াকিন’ রাখতাম, তাহলে প্রাচুর্যের মোহে এভাবে গাফেল হয়ে থাকতাম না।

আর ‘আইনুল ইয়াকিন’ (عَيْنَ الْيَقِينِ) হলো নিজের চোখে সেই সত্যকে দেখা, যা কিয়ামতের দিন ঘটবে। সেদিন আর কোনো সংশয় থাকবে না।

সবশেষে, সূরাটি শেষ হচ্ছে এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে, যা এই সূরার সবচেয়ে ভীতি সঞ্চারকারী আয়াত:

ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ (8)

অর্থ: “অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদেরকে প্রদত্ত নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আত-তাকাসুর: ৮)

ব্যাখ্যা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:

‘নাঈম’ (النَّعِيمِ) শব্দটি দ্বারা সব ধরনের নেয়ামত বোঝানো হয়েছে। শুধু ধন-সম্পদ নয়, বরং সুস্থতা, নিরাপত্তা, অবসর সময়, জ্ঞান, পরিবার, এমনকি এক গ্লাস ঠান্ডা পানি—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

কিয়ামতের দিন আমাদের প্রশ্ন করা হবে, “আমি তোমাকে যে চোখ দিয়েছিলাম, তা দিয়ে কী দেখেছ? যে কান দিয়েছিলাম, তা দিয়ে কী শুনেছ? যে সুস্থতা দিয়েছিলাম, তা কোথায় ব্যয় করেছ? যে অর্থ দিয়েছিলাম, তা কীভাবে উপার্জন করেছ এবং কোথায় খরচ করেছ?”

এই আয়াতটি আমাদের এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি করে। আমরা আরও নেয়ামত পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছি, অথচ আল্লাহ বলছেন, যে নেয়ামতগুলো ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে, সেগুলোরই হিসাব নেওয়া হবে।

এই আয়াতের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা আমরা পাই একটি বিখ্যাত হাদীসে, যা এই দারসের শুরুতে উল্লেখিত ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ), আবু বকর (রা) ও উমর (রা) ক্ষুধার্ত অবস্থায় একজন আনসারী সাহাবীর বাড়িতে আপ্যায়িত হয়েছিলেন। খেজুর ও গোশত দিয়ে তৃপ্ত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন:

“সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, কিয়ামতের দিন তোমরা এই সমস্ত নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহীহ মুসলিম: ২০৩৮)

একটু ভাবুন, তীব্র ক্ষুধার পর পাওয়া সামান্য খাবার যদি জিজ্ঞাসার কারণ হয়, তাহলে আজ আমরা প্রতিদিন যে অগণিত নেয়ামত ভোগ করছি—বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর, ফ্রিজের ঠান্ডা পানি, ফোনের এক ক্লিকে পৃথিবীর সব খবর—এগুলোর হিসাব কতটা কঠিন হবে?

উপসংহার ও আমাদের করণীয়:

সূরা আত-তাকাসুর আমাদের একটি জীবন-পরিবর্তনকারী বার্তা দেয়। এর শিক্ষা হলো:

১. জীবনের অগ্রাধিকার ঠিক করা: দুনিয়ার প্রাচুর্য অর্জন জীবনের মূল লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষামাত্র। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের প্রস্তুতি।

২. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা: আরও বেশি পাওয়ার লোভ না করে, আল্লাহ যা দিয়েছেন তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা। প্রতিটি নেয়ামতকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করা।

৩. জবাবদিহিতার অনুভূতি: সর্বদা মনে রাখা যে, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সম্পদ এবং প্রতিটি সুযোগের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

৪. অনাড়ম্বর জীবনযাপন: ভোগবাদী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ জমানোর প্রতিযোগিতা ত্যাগ করা এবং সাদাসিধে জীবনযাপনে শান্তি খোঁজা।

আসুন, আমরা এই সূরাটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। আমাদের জীবনকে ‘তাকাসুর’ বা প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা থেকে বের করে ‘শুকুর’ বা কৃতজ্ঞতার পথে নিয়ে আসি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ভয়াবহ মোহ থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের নেয়ামতগুলোর সঠিক হিসাব দেওয়ার তাওফিক দান করুন।

আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top