আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমার প্রিয় ভাই, আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে এসেছি যা আমার এবং আপনার মতো অনেক মুসলিমের হৃদয়ে গভীর দ্বিধা এবং যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। আমরা সেই মুসলিম যারা আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বে, তাঁর একচ্ছত্র শাসনে (তাওহীদ আল-হাকিমিয়্যাহ) পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করি। আমাদের চূড়ান্ত স্বপ্ন, আমাদের জীবনের লক্ষ্য হলো আল্লাহ্র যমীনে আল্লাহ্র আইন, পবিত্র শরীয়াহ-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, তথা খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ (নবুওয়তের আদলে খেলাফত) ফিরে আসা।
এই বিশ্বাস থেকেই আমাদের হৃদয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন জন্ম নেয়: যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মানুষের সার্বভৌমত্বকে (অর্থাৎ, “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস”) স্বীকৃতি দেয়, তা কি আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক নয়? অবশ্যই। এই অর্থে গণতন্ত্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বা আদর্শ (Ideology) হিসেবে গ্রহণ করা স্পষ্ট শিরক (আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থাপন)। কারণ আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল আল্লাহ্র।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহ্রই।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৪০)
তিনি আরও বলেন:
“আর আল্লাহ্ নিজ কর্তৃত্বে কাউকে শরীক করেন না।” (সূরা কাহফ, ১৮:২৬)
এই বিশ্বাস আমাদের ঈমানের ভিত্তি। আর ঠিক একারণেই, যখন আমাদের সামনে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন আসে, তখন আমরা মুখ ফিরিয়ে নিই। আমরা বলি, “আমি এই শিরকি ব্যবস্থার অংশ হতে পারি না।” আমি আপনার এই অনুভূতিকে, এই ঈমানী গায়রতকে (আত্মমর্যাদাবোধ) অন্তর থেকে সম্মান করি। কারণ এর উৎস হলো আল্লাহ্র প্রতি আপনার নিখাদ ভালোবাসা এবং তাওহীদের প্রতি আপনার আপোষহীনতা।
কিন্তু ভাই, জীবন সবসময় সাদা আর কালোর মতো সহজ নয়। ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র) আমাদের শুধু আদর্শ শেখায় না, সেই আদর্শকে বাস্তবতার জটিল আবর্তে কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, সেই প্রজ্ঞাও দান করে।
আজ আমি আপনার সামনে সেই প্রেক্ষাপটটিই তুলে ধরছি, যা আপনি নিজেই বর্ণনা করেছেন:
আগামী মাসে নির্বাচন। আমাদের সামনে দুটি বাস্তব বিকল্প:
১. একটি সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) দল: আমরা নিশ্চিত জানি, এরা ক্ষমতায় এলে জুলুম-নির্যাতন চালাবে, ইসলাম পালনে বাধা দেবে, আলেমদের জেলে ভরবে এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করবে।
২. একটি ‘ইসলামিক’ রাজনৈতিক দল: এরাও এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনেই নির্বাচন করছে। আমরা জানি, তারা ক্ষমতায় এলেও পূর্ণ শরীয়াহ বা খেলাফত কায়েম করতে পারবে না (বা করবে না)। কিন্তু আমরা এটাও নিশ্চিত যে, তারা ক্ষমতায় থাকলে অন্তত জুলুম বন্ধ হবে, মানুষ শান্তিতে ধর্ম পালন করতে পারবে, মসজিদ-মাদ্রাসা নিরাপদ থাকবে।
৩. আমাদের নিষ্ক্রিয়তা (ভোট না দেওয়া): আমাদের ভোট না দেওয়ার ফলে যদি সেকুলার দলটি জয়ী হয়ে যায়, তবে আমরা নিশ্চিত জুলুমের শিকার হবো।
এই পরিস্থিতিতে, কোরআন ও সুন্নাহর গভীরতর নীতিমালার আলোকে আমাদের কী করা উচিত? “শিরকের” ভয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা, নাকি বৃহত্তর বিপর্যয় রোধে একটি পদক্ষেপ নেওয়া?
এই আর্টিকেলে, আমি ফিকহের সেই মূলনীতিগুলোর আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব, কেন আমি মনে করি এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভোট দেওয়াটা শুধু জায়েজই নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পর্ব ১: মূলনীতি এক – দুটি ক্ষতির মধ্যে কম ক্ষতিকরটি (أخف الضررين) বেছে নেওয়া
ইসলামী শরীয়তের একটি মহৎ এবং সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি হলো: “إذا تعارض مفسدتان روعي أعظمهما ضرراً بارتكاب أخفهما”
অর্থাৎ, “যখন দুটি ক্ষতিকর বিষয় বা বিপর্যয় একসাথে উপস্থিত হয় এবং কোনোটিই এড়ানো সম্ভব না হয়, তখন বৃহত্তর ক্ষতিটিকে প্রতিহত করার জন্য ক্ষুদ্রতর ক্ষতিটি গ্রহণ করা হবে।”
এটি কোনো মনগড়া কথা নয়, এটি কোরআন ও সুন্নাহর গভীর প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত। আসুন, আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে এই নীতি দিয়ে বিচার করি:
- ক্ষতি ১ (ক্ষুদ্রতর): একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া। এটি আমাদের আকিদার পরিপন্থী একটি ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ক্ষতি। এটি একটি আদর্শিক ক্ষতি (المفسدة الصغرى)।
- ক্ষতি ২ (বৃহত্তর): আমাদের নিষ্ক্রিয়তার ফলে একটি ইসলামবিদ্বেষী, সেকুলার ও জালেম শক্তির ক্ষমতায় আসা। এর ফলে মুসলিমদের জান, মাল, ইজ্জত এবং সর্বোপরি তাদের দ্বীন পালনের স্বাধীনতা (যা শরীয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য বা মাকাসিদ আশ-শারীয়াহ’র অংশ) এক ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। এটি একটি বাস্তব, শারীরিক এবং ধর্মীয় বিপর্যয় (المفسدة الكبرى)।
ফিকহের এই নীতি বলে, আমাদের অবশ্যই ক্ষুদ্রতর ক্ষতিটি (ভোট দেওয়া) গ্রহণ করতে হবে, যাতে আমরা উম্মাহকে বৃহত্তর ক্ষতি (জুলুম ও দ্বীন পালনের বাধাপ্রাপ্তি) থেকে রক্ষা করতে পারি।
কোরআন থেকে দলীল:
এর একটি চমৎকার উদাহরণ আমরা পাই সূরা কাহাফে, খিজির (আ.) এবং মুসা (আ.)-এর ঘটনায়। খিজির (আ.) একটি ভালো নৌকাকে ফুটো করে দিয়েছিলেন। বাহ্যিকভাবে, এটি একটি অন্যায় কাজ, একটি ক্ষতি। কিন্তু এর পেছনে কারণ কী ছিল?
“নৌকাটির ব্যাপার হলো, সেটি ছিল কিছু দরিদ্র লোকের। তারা সমুদ্রে কাজ করত। আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চাইলাম, কারণ তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে প্রতিটি (ভালো) নৌকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিত।” (সূরা কাহফ, ১৮:৭৯)
খিজির (আ.) কী করলেন? তিনি একটি বৃহত্তর ক্ষতি (রাজা কর্তৃক পুরো নৌকা বাজেয়াপ্ত হওয়া) প্রতিহত করার জন্য একটি ক্ষুদ্রতর ক্ষতি (নৌকাটিকে সামান্য ফুটো করা) সম্পাদন করলেন। তিনি জানতেন, ফুটো নৌকাটি দরিদ্র মালিকরা মেরামত করতে পারবেন, কিন্তু নৌকাটি একবারেই হারিয়ে গেলে তারা নিঃস্ব হয়ে যাবেন।
আমাদের পরিস্থিতিও ঠিক একই। সেকুলার দলের বিজয় হলো সেই রাজার মতো, যে আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার সবকিছু ছিনিয়ে নিতে প্রস্তুত। আর ‘ইসলামিক’ দলকে ভোট দেওয়া হলো নৌকাটি ফুটো করার মতো—একটি অপছন্দনীয় কাজ, একটি আপোস, কিন্তু তা করা হচ্ছে আমাদের মূলধন (দ্বীন পালনের স্বাধীনতা) রক্ষা করার জন্য।
আরেকটি শক্তিশালী দলীল:
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“যে ব্যক্তি তার ঈমান আনার পর আল্লাহ্কে অস্বীকার করে… (তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি); তবে সে ব্যক্তি নয়, যাকে (কুফরিতে) বাধ্য করা হয়, অথচ তার অন্তর ঈমানে পরিতৃপ্ত।” (সূরা নাহল, ১৬:১০৬)
চিন্তা করুন, ভাই! আল্লাহ তা’আলা প্রাণের ভয়ে (যা একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি) বাধ্য হয়ে মুখে কুফরি কথা উচ্চারণ করাকেও ক্ষমা করে দিচ্ছেন, যতক্ষণ অন্তর ঈমানে স্থির থাকে।
তাহলে, যে ব্যক্তি তার নিজের প্রাণের জন্য নয়, বরং লক্ষ লক্ষ মুসলিমের ইজ্জত, সম্মান এবং দ্বীন পালনের স্বাধীনতা (যা একটি সামষ্টিক প্রয়োজন) রক্ষার জন্য, বাধ্য হয়ে (কারণ তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই) এমন একটি ব্যবস্থায় (গণতন্ত্রে) শুধু একটি ভোট প্রদান করে—যার প্রতি তার অন্তরে বিন্দুমাত্র ঈমান বা বিশ্বাস নেই—আল্লাহ কি তাকে ক্ষমা করবেন না?
অবশ্যই, কুফরি কথা মুখে উচ্চারণের চেয়ে একটি ভোট প্রদান অনেক কম গুরুতর। আর ব্যক্তিগত জীবন বাঁচানোর চেষ্টার চেয়ে উম্মাহর সামষ্টিক দ্বীন ও জীবন বাঁচানোর চেষ্টা আল্লাহ্র কাছে অনেক বেশি অগ্রগণ্য।
পর্ব ২: মূলনীতি দুই – কল্যাণ অর্জনের চেয়ে ক্ষতি রোধ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ (درء المفاسد أولى من جلب المصالح)
ইসলামী ফিকহের আরেকটি স্তম্ভ হলো এই মূলনীতি: “কল্যাণ অর্জনের চেষ্টার চেয়ে বিপর্যয় বা ক্ষতি রোধ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।”
এর অর্থ হলো, যখন আপনার সামনে দুটি কাজ থাকে—একটি হলো কোনো ভালো কাজ করা (যেমন, নফল ইবাদত) এবং অন্যটি হলো কোনো ক্ষতি বা বিপর্যয় রোধ করা (যেমন, কাউকে বিপদ থেকে বাঁচানো)—তখন বিপর্যয় রোধ করাটাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।
আসুন, এটি আমাদের পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করি:
- কল্যাণ অর্জন (جلب المصالح): আমাদের সর্বোচ্চ কল্যাণ হলো খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আপনার আমার বর্ণনানুযায়ী, এই মুহূর্তে সেই সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ (০%)।
- বিপর্যয় রোধ (درء المفاسد): আমাদের সামনে উপস্থিত এবং নিশ্চিত বিপর্যয় হলো সেকুলার দলের মাধ্যমে আসা জুলুম, নির্যাতন এবং দ্বীন পালনে বাধা।
সুতরাং, এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান শর’ঈ দায়িত্ব (ওয়াজিব) কী? একটি অসম্ভব কল্যাণ (খেলাফত) অর্জনের আশায় বসে থাকা? নাকি একটি নিশ্চিত বিপর্যয় (জুলুম) প্রতিহত করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করা?
অবশ্যই, বিপর্যয় রোধ করা।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো মন্দ (অন্যায়) কাজ দেখবে, সে যেন তা তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি সে ক্ষমতা না রাখে, তবে তার জিহ্বা দ্বারা। আর যদি সে ক্ষমতাও না রাখে, তবে তার অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এটিই হলো ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহীহ মুসলিম)
এখন ভাবুন, একটি জালেম ও ইসলামবিদ্বেষী সেকুলার দলের ক্ষমতায় আসাটা কি একটি নিশ্চিত “মুনকার” (মন্দ কাজ) নয়? অবশ্যই।
আমার হাতে যদি সেই “মুনকার” প্রতিহত করার একটি বাস্তব উপায় (ভোট) থাকে, যার মাধ্যমে আমি একটি তুলনামূলক কম মন্দ দলকে ক্ষমতায় এনে সেই জুলুম প্রতিহত করতে পারি, তাহলে কি “হাত দ্বারা প্রতিহত করার” এই আদেশের আওতায় তা পড়ে না?
যদি আমি তা না করি, তবে আমি কি কেবল “অন্তর দ্বারা ঘৃণা” করার দুর্বলতম স্তরেই রয়ে গেলাম না, যদিও আমার কাছে “হাত দ্বারা” (অর্থাৎ, ভোট প্রদানের মাধ্যমে) তা প্রতিহত করার সুযোগ ছিল? আমি যদি আমার একটি ভোটের অভাবে সেই জালেমকে ক্ষমতায় আসতে দিই, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র কাছে কি এই নিষ্ক্রিয়তার জবাবদিহি করতে হবে না?
পর্ব ৩: ‘শিরক’-এর ধারণা এবং নিয়তের (উদ্দেশ্য) ভূমিকা
এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিয়ে কথা বলি, যা আমাদের সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়: “ভোট দিলেই কি আমি মুশরিক হয়ে যাব?”
ভাই, এই ধারণাটি একটি সূক্ষ্ম ভুল বোঝাবুঝির উপর প্রতিষ্ঠিত। আসুন, দুটি বিষয়কে আলাদা করি:
১. গণতন্ত্রকে ‘আকিদা’ বা ‘দ্বীন’ হিসেবে বিশ্বাস করা: এটা নিঃসন্দেহে শিরক। এর অর্থ হলো বিশ্বাস করা যে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা মানুষের আছে, আল্লাহ্র নেই।
২. গণতন্ত্রকে একটি ‘হাতিয়ার’ বা ‘ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যবহার করা: এটা শিরক নয়, বরং এটি একটি ‘ইজতিহাদ’ (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) বা ‘ফিকহি’ (আইনগত) বিষয়।
একটি উদাহরণ দিই। ফেসবুক বা ইউটিউব কি ইসলামিক কোনো প্ল্যাটফর্ম? না। এর প্রতিষ্ঠাতারা মুসলিম নন এবং এখানে অগণিত হারাম ও অশ্লীল বিষয় রয়েছে। কিন্তু আপনি বা আমি যখন দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য, অথবা জালেমের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করি, তখন কি আমরা হারামে লিপ্ত হচ্ছি, না-কি একটি জায়েজ উদ্দেশ্যে একটি (আপাতদৃষ্টিতে) কলুষিত মাধ্যম ব্যবহার করছি?
অবশ্যই, আমরা দাওয়াতের কাজ করছি। ঠিক তেমনি, গণতান্ত্রিক নির্বাচন একটি কলুষিত ব্যবস্থা। কিন্তু আমি যখন সেই ব্যবস্থায় একটি ভোট দিচ্ছি, তখন আমার নিয়ত কী?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“সমস্ত আমল (কাজ) নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (সহীহ বুখারী)
আমার নিয়ত যদি এই হয় যে, “আমি এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নিলাম, আমি বিশ্বাস করি জনগণই সার্বভৌম”—তবে তা অবশ্যই শিরক।
কিন্তু আমার নিয়ত যদি হয়:
১. “হে আল্লাহ, আমি এই ব্যবস্থাকে ঘৃণা করি। আমি খেলাফতে বিশ্বাস করি।”
২. “কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মুসলিম ভাই-বোনদেরকে জালেমের নিশ্চিত জুলুম থেকে বাঁচানোর জন্য আমার হাতে এই ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
৩. “আমি এই ভোটটি দিচ্ছি ‘দুটি মন্দের মধ্যে কম মন্দ’ হিসেবে, জালেমকে প্রতিহত করার ‘ওয়াসিলা’ (মাধ্যম) হিসেবে, আমার উম্মাহর দ্বীন ও জান রক্ষার ‘হাতিয়ার’ হিসেবে।”
…তবে এই নিয়ত কি শিরক হতে পারে? কক্ষনো না। বরং, এই নিয়ত হলো উম্মাহর জন্য হিতাকাঙ্ক্ষা, যা ঈমানের দাবি।
সাহাবাদের জীবন থেকে শিক্ষা:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সাহাবীদের মক্কার মুশরিকদের জুলুম থেকে বাঁচতে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন, তখন তারা কোথায় গিয়েছিলেন?
তারা এমন একজন রাজার (নাজ্জাশি) শাসনাধীন রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যিনি তখনো মুসলিম ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান। তিনি কি আল্লাহ্র আইন (শরীয়াহ) দিয়ে রাজ্য চালাতেন? না, তিনি তার নিজস্ব আইন বা খ্রিস্টান ধর্মীয় আইন দিয়ে চালাতেন।
সাহাবায়ে কিরাম (রা.) একটি ‘গায়রুল্লাহর’ (আল্লাহ্র বিধানবহির্ভূত) আইনের অধীনে বসবাস করাকে মেনে নিলেন কেন? কারণ, এটি ছিল মক্কার জুলুম (বৃহত্তর ক্ষতি) এবং আবিসিনিয়ার অমুসলিম রাজার অধীনে শান্তিতে ধর্ম পালন (ক্ষুদ্রতর ক্ষতি বা আপেক্ষিক কল্যাণ)—এই দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া।
তারা কি নাজ্জাশির শাসন ব্যবস্থাকে ‘শিরক’ বলে বর্জন করেছিলেন? না। তারা প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা বুঝেছিলেন, দ্বীন বাঁচানো এবং জুলুম থেকে পালানো প্রথম অগ্রাধিকার।
আমাদের পরিস্থিতিও এর থেকে ভিন্ন নয়। আমরা একটি জালেম, ইসলামবিদ্বেষী সেকুলার শাসন (মক্কার মুশরিকদের মতো) এবং একটি অ-পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শাসন (নাজ্জাশির শাসনের মতো, যারা অন্তত ধর্ম পালনে বাধা দেবে না)—এর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছি।
পর্ব ৪: কিছু সাধারণ বিভ্রান্তি ও তার জবাব
বিভ্রান্তি ১: “ভোট দেওয়া মানেই তাগুতকে (সীমালঙ্ঘনকারী শাসক) সমর্থন করা। উভয় দলই তাগুত।”
এই কথাটি তত্ত্বগতভাবে সত্য হলেও, বাস্তবতার নিরিখে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ইসলামী শরীয়ত “কুফর” (অবিশ্বাস) এবং “জুলুম” (অত্যাচার)-এর মধ্যে পার্থক্য করে।
আমাদের দৃশ্যপটে:
- সেকুলার দলটি হলো = কুফর + জুলুম (তারা ব্যবস্থার দিক থেকেও ইসলামবিরোধী এবং কাজের দিক থেকেও মুসলিমদের প্রতি অত্যাচারী)।
- ইসলামিক দলটি হলো = কুফর (ব্যবস্থার দিক থেকে) + আদল/ইসলামী পরিবেশ (কাজের দিক থেকে) (তারা শিরকি ব্যবস্থার অংশ, কিন্তু তারা জুলুম করবে না, বরং ধর্ম পালনে সহায়তা করবে)।
শরীয়ত আমাদের বলে, “কুফর” এবং “জুলুম” যখন একীভূত হয়, তা সবচেয়ে ভয়াবহ। একজন অবিশ্বাসী কিন্তু ন্যায়পরায়ণ শাসক (যেমন নাজ্জাশি ছিলেন প্রথমে), একজন বিশ্বাসী কিন্তু জালেম শাসকের (যেমন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ) চেয়ে উত্তম।
আর আমাদের সামনে তো চয়েস আরও সহজ: একটি দল (সেকুলার) যারা নিশ্চিত জালেম, আর অন্য দল (ইসলামিক) যারা নিশ্চিতভাবেই জালেম নয়, বরং মুসলিম-বান্ধব। এখানে উভয়কে “সমান তাগুত” বলাটা ফিকহের প্রজ্ঞার পরিপন্থী। এটি বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
বিভ্রান্তি ২: “আমাদের উচিত সবর করা এবং আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল করা, এই নাপাক ব্যবস্থায় অংশ না নেওয়া।”
ভাই, তাওয়াক্কুল (আল্লাহ্র উপর নির্ভরতা) মানে নিষ্ক্রিয়তা বা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। তাওয়াক্কুল মানে হলো, সাধ্যের মধ্যে সমস্ত বৈধ উপায় (আসবার) গ্রহণ করার পর তার ফলাফলের জন্য আল্লাহ্র উপর নির্ভর করা।
রাসূল (ﷺ) কি উহুদের যুদ্ধে বর্ম পরেননি? তিনি কি খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করেননি? তিনি কি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি?
যদি তিনি শুধু তাওয়াক্কুলের নামে গুহায় বসে থাকতেন, তাহলে কি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতো?
আজকের দিনে, জালেমকে প্রতিহত করার জন্য আমাদের হাতে যে বৈধ ‘সাবাব’ বা উপায়টি আছে, তা হলো এই ভোট। এই উপায়টি গ্রহণ না করে জুলুমের শিকার হওয়াকে “সবর” বা “তাওয়াক্কুল” বলে না; একে শরীয়তের ভাষায় “তাওয়াকুল” (تهاكل) বা নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা বলে, যা নিন্দনীয়।
আমাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে যদি একজন মুসলিম ভাইও নির্যাতিত হন, একটি বোনও হিজাবের কারণে অপমানিত হন, বা একটি মসজিদও বন্ধ হয়ে যায়—তবে আল্লাহ্র কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে যে, কেন আমরা তা প্রতিহত করার সাধ্যমতো চেষ্টা করিনি।
উপসংহার: এক তিক্ত কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত
ভাই আমার, আমি জানি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। এই ভোট দেওয়াটা কোনো আনন্দের বিষয় নয়। এটা অনেকটা জীবন বাঁচানোর জন্য হারাম পশুর মাংস খাওয়ার মতো—যা শুধু চরম প্রয়োজনের (দারুরাহ) সময়ই জায়েজ হয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে আমাদের সামনে “ভালো” এবং “মন্দের” মধ্যে বাছাই করার সুযোগ নেই। আমাদের বাছাই করতে হচ্ছে “মন্দ” এবং “অধিকতর মন্দের” মধ্যে।
আমার আকিদা, আমার বিশ্বাস, আমার স্বপ্ন—সবকিছুই খেলাফত। কিন্তু আমার ফিকহ, আমার প্রজ্ঞা, আমার বাস্তবতা আমাকে বলে যে, আমি আমার স্বপ্ন পূরণের আশায় আমার ভাইদেরকে কসাইয়ের ছুরির নিচে ঠেলে দিতে পারি না।
পূর্ণ ইসলাম (খেলাফত) কায়েম করা যদি এই মুহূর্তে সম্ভব না হয়, তার মানে এই নয় যে, আমি ইসলামের আংশিক (যেমন, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, জুলুম থেকে মুক্তি) অর্জনকেও বর্জন করব। ফিকহের আরেকটি মূলনীতি হলো: “ما لا يدرك كله لا يترك كله”
“যা পুরোপুরি অর্জন করা যায় না, তা পুরোপুরি বর্জন করাও যায় না।”
তাই, আমি যখন আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভোট দিতে যাব, তখন আমার অন্তরে গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা থাকবে না। আমার অন্তরে থাকবে মুসলিম উম্মাহর জন্য হিতাকাঙ্ক্ষা। আমার নিয়ত হবে—শিরককে সমর্থন করা নয়, বরং জুলুমকে প্রতিহত করা।
আমি এই পদক্ষেপকে “ইবাদত” মনে করছি না, বরং “প্রয়োজন” (Darurah) মনে করছি। আমি এই ভোটটি দিচ্ছি, কারণ আমার নিষ্ক্রিয়তা আমার দ্বীন এবং আমার ভাইদের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
হে আল্লাহ, আমরা এক কঠিন ফিতনার সময়ে বাস করছি। আপনি আমাদের অন্তরের গোপন খবর জানেন। আমরা এই শিরকি ব্যবস্থাকে ঘৃণা করি, কিন্তু আমরা আপনার বান্দাদের ভালোবাসি এবং তাদের জুলুম থেকে রক্ষা করতে চাই। আপনি আমাদের এই ইজতিহাদকে কবুল করুন, আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন এবং মুসলিম উম্মাহকে এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখান। আমীন।